নিজস্ব প্রতিবেদক :
চাঁদপুরের ফরিদগঞ্জে নিয়ম-নীতির তোয়াক্কা না করে বাসাবাড়িতে ব্যবহৃত এলপিজি গ্যাসের সিলিন্ডার স্থানীয় একটি ফিলিং স্টেশনে রিফিল করে বাজারজাত করার অভিযোগ উঠেছে। এতে পরীক্ষা-নিরীক্ষা ছাড়াই রিফিল করা সিলিন্ডার ব্যবহারের কারণে সাধারণ গ্রাহকদের জীবন ও সম্পদ মারাত্মক ঝুঁকির মধ্যে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
ফরিদগঞ্জ পৌরসভার ভাটিয়ালপুর এলাকায় অবস্থিত জে.কে এলপিজি ফিলিং স্টেশন থেকে বিভিন্ন কোম্পানির বাসাবাড়িতে ব্যবহৃত খুচরা গ্যাস সিলিন্ডার রিফিল করে সরবরাহের বিষয়টি প্রকাশ্যে আসে। ফরিদগঞ্জ সরকারি কলেজ রোড এলাকার ব্যবসায়ী রেজাউল করিমের গোডাউনে ফিলিং স্টেশন থেকে রিফিল করা সিলিন্ডার পাওয়ার পর বিষয়টি সামনে আসে।
সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, অনুমোদিত প্রক্রিয়ায় বাসাবাড়িতে ব্যবহৃত এলপিজি সিলিন্ডার পুনরায় গ্যাস ভরার আগে সংশ্লিষ্ট কোম্পানির কারখানায় প্রতিটি খালি সিলিন্ডার পরীক্ষা করা হয়। সিলিন্ডারে মরিচা, ফাটল বা অন্য কোনো ক্ষতি রয়েছে কি না, মেয়াদ ঠিক আছে কি না—এসব বিষয় যাচাই করা হয়। এরপর সিলিন্ডারের ময়লা পরিষ্কার করে ভেতরে অবশিষ্ট গ্যাস বা তরল থাকলে তা নিরাপদ উপায়ে অপসারণ করা হয়।
পরে নির্ধারিত প্রক্রিয়ায় সিলিন্ডারে এলপিজি ভরা হয় এবং ডিজিটাল ফিলিং মেশিনের মাধ্যমে গ্যাসের সঠিক পরিমাণ নিশ্চিত করা হয়। গ্যাস ভরার পর ভালভ সঠিকভাবে আটকানো, লিকেজ পরীক্ষা, কোম্পানির সিল, সেফটি ক্যাপ এবং ওজনের স্টিকার বা লেবেল লাগানোর মতো ধাপও অনুসরণ করা হয়। এসব পরীক্ষা ছাড়া সিলিন্ডার রিফিল ও বাজারজাত করা হলে তা ব্যবহারকারীর জন্য মারাত্মক ঝুঁকি তৈরি করতে পারে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
অভিযোগ রয়েছে, বাজারমূল্যের তুলনায় কম দামে সিলিন্ডার সংগ্রহ করে অধিক লাভে বিক্রির আশায় একটি চক্র স্থানীয় ফিলিং স্টেশন থেকে কোনো ধরনের প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা ছাড়াই বিভিন্ন কোম্পানির বাসাবাড়িতে ব্যবহৃত এলপিজি সিলিন্ডার রিফিল করে বাজারজাত করছে।
অভিযোগের বিষয়ে গত ১০ ও ১২ আগস্ট জে.কে এলপিজি ফিলিং স্টেশন থেকে ব্যবসায়ী রেজাউল করিমের সরবরাহ করা বিভিন্ন কোম্পানির প্রায় ২৩টি এলপিজি সিলিন্ডার রিফিল করে তাকে দেওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে। পরে ওই সিলিন্ডারগুলো বিভিন্ন বাসাবাড়ি ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে বিক্রি করা হয়।
গত বৃহস্পতিবার (১৩ আগস্ট) রাতে ব্যবসায়ী রেজাউল করিমের গোডাউনে গিয়ে জে.কে এলপিজি ফিলিং স্টেশন থেকে রিফিল করা বেশ কয়েকটি সিলিন্ডার পাওয়া যায়। এ বিষয়ে জানতে চাইলে রেজাউল করিম ফিলিং স্টেশন থেকে সিলিন্ডার রিফিল করে আনার বিষয়টি স্বীকার করেন।
তিনি বলেন, “গত দুইদিনে আমি মোট ২৩টি সিলিন্ডার তাদের কাছ থেকে রিফিল করেছি।” এভাবে সিলিন্ডার রিফিল করা বেআইনি ও ঝুঁকিপূর্ণ কি না—এ বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বিষয়টি জানেন না বলে দাবি করেন। তার ভাষ্য, “ফিলিং স্টেশন আমাদের কাছে বিক্রি করছে বলেই আমরা কিনেছি।”
এদিকে একই রাতে জে.কে এলপিজি ফিলিং স্টেশনে গিয়ে প্রতিষ্ঠানটির বর্তমান কর্ণধার তাফাজ্জল হোসেন তাফুর সঙ্গে কথা বলা হয়। তিনি জানান, ১৩ আগস্ট সকালে তিনি ওমরাহ পালন শেষে দেশে ফিরেছেন। তার অনুপস্থিতিতে ফিলিং স্টেশনের কর্মচারী সজিব এ কাজ করেছেন বলে তিনি জানতে পেরেছেন।
বাসাবাড়িতে ব্যবহৃত সিলিন্ডার এভাবে রিফিল করা বেআইনি ও সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ কি না—এ বিষয়ে জানতে চাইলে তাফাজ্জল হোসেন তাফু বলেন, “আমি এটা জানি। যারা করেছে, তাদের বিরুদ্ধে আমি ব্যবস্থা নিচ্ছি।”
এ ঘটনায় স্থানীয় এলপিজি ব্যবসায়ীদের মধ্যেও উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। বেশি লাভের আশায় নিরাপদ ও অনুমোদিত প্রক্রিয়ায় বাজারজাত করা সিলিন্ডারের পরিবর্তে পরীক্ষা-নিরীক্ষাবিহীন ঝুঁকিপূর্ণ সিলিন্ডার গ্রাহকদের হাতে তুলে দেওয়ার অভিযোগে জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন ফরিদগঞ্জের এলপিজি গ্যাস বিক্রয়কারী ডিলার আমজাদ হোসেন, সাহাবুদ্দিনসহ কয়েকজন ব্যবসায়ী।
তাদের দাবি, এলপিজি সিলিন্ডার অত্যন্ত সংবেদনশীল ও ঝুঁকিপূর্ণ পণ্য। যথাযথ পরীক্ষা ছাড়া সিলিন্ডার রিফিল করে বাজারজাত করা হলে যেকোনো সময় দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। তাই সাধারণ মানুষের নিরাপত্তার স্বার্থে এ ধরনের কর্মকাণ্ড বন্ধে প্রশাসনের কঠোর নজরদারি প্রয়োজন।
এ বিষয়ে ফরিদগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সেটু কুমার বড়ুয়া বলেন, “বেআইনিভাবে কোনো গ্যাস সিলিন্ডার রিফিল ও বাজারজাত করা হলে তদন্তপূর্বক তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সাধারণ মানুষের জীবন ও সম্পদের নিরাপত্তার সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত হওয়ায় বিষয়টি দ্রুত তদন্ত করে প্রকৃত ঘটনা উদঘাটন এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।
