২৮শে অক্টোবর, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ

অক্টোবর ৬, ২০২৬

আজকের সংবাদ, চাঁদপুর

হাইমচরে ফার্মেসিতে অভিযান চালিয়ে মেয়াদোত্তীর্ণ ঔষধ বিক্রির দায়ে জরিমানা 

মো. আক্তার হোসেন, হাইমচর :   চাঁদপুরের হাইমচর উপজেলার সদর আলগীবাজারে মোবাইলকোর্ট পরিচালনা করে পাঁচটি ফার্মেসি ও এক দোকানিকে মোট ৫৭ হাজার টাকা অর্থদণ্ড দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে পাঁচটি ফার্মেসিকে বিভিন্ন অনিয়মের দায়ে ৫৫ হাজার টাকা এবং রাস্তা দখল করে জনসাধারণের চলাচলে বিঘ্ন ঘটানোর অপরাধে এক ব্যক্তিকে ২ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়। মঙ্গলবার (৬ অক্টোবর) আলগীবাজারে এ মোবাইলকোর্ট পরিচালনা করেন হাইমচর উপজেলা নির্বাহী অফিসার মো. নজরুল ইসলাম। অভিযানকালে আলগীবাজারের বিভিন্ন ফার্মেসিতে ওষুধের মজুত, মেয়াদ, অনুমোদন, লাইসেন্স ও বিক্রয়সংক্রান্ত বিষয় পরিদর্শন করা হয়। এ সময় ড্রাগ লাইসেন্স ও ট্রেড লাইসেন্স না থাকা, ফিজিশিয়ান স্যাম্পল বিক্রি, নিয়মবহির্ভূতভাবে অ্যান্টিবায়োটিক বিক্রয়সহ বিভিন্ন অনিয়মের অভিযোগে হাসিব মেডিসিন কর্নার, রাখী মেডিকেল হল, লাজ ফার্মেসি, পলাশ মেডিকেল এবং পপুলার এগ্রো অ্যান্ড পোল্ট্রি ফিডকে সর্বমোট ৫৫ হাজার টাকা অর্থদণ্ড করা হয়। অভিযানে পলাশ মেডিকেল হলের স্বত্বাধিকারী সুমন দেবনাথকে ২৫ হাজার টাকা অর্থদণ্ড দেওয়া হয়। বাকি প্রতিষ্ঠানগুলোর জরিমানার পৃথক পরিমাণ তাৎক্ষণিকভাবে জানানো হয়নি। এছাড়া আলগীবাজারে রাস্তা দখল করে জনসাধারণের চলাচলে বিঘ্ন সৃষ্টি করার অপরাধে আব্দুস সালাম নামে এক ব্যক্তিকে ২ হাজার টাকা অর্থদণ্ড করা হয়। মোবাইলকোর্ট পরিচালনাকালে ওষুধ প্রশাসন অধিদপ্তরের প্রতিনিধি প্রসিকিউশন দাখিল করেন। এ সময় উপজেলা প্রশাসনের কর্মচারী এবং হাইমচর থানা পুলিশের একটি দল সার্বিক সহযোগিতা করে। অভিযানকালে ফার্মেসি মালিকদের মেয়াদোত্তীর্ণ ও অনুমোদনবিহীন ওষুধ বিক্রি না করা এবং চিকিৎসকের প্রেসক্রিপশন ছাড়া অ্যান্টিবায়োটিক বিক্রি থেকে বিরত থাকার বিষয়ে সতর্ক করা হয়। একই সঙ্গে ওষুধ বিক্রির ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট আইন ও বিধিবিধান যথাযথভাবে অনুসরণের ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়।

আজকের সংবাদ, ফরিদগঞ্জ, মতামত

জনদুর্ভোগ লাঘব ও নাগরিক সেবা সহজীকরণের লক্ষ্যে সুবিদপুর উপজেলার প্রস্তাব

মোস্তফা কামাল যাত্রা :  প্রিয় ফরিদগঞ্জ উপজেলা নিবাসী সর্বস্তরের জনগণ, আসসালামু আলাইকুম। ফরিদগঞ্জ উপজেলা ও চাঁদপুর জেলার মানচিত্রে পূর্ব ও পশ্চিম সুবিদপুর ইউনিয়নদ্বয়ের অবস্থান এবং উপজেলা ও জেলা সদরের সঙ্গে দূরত্ব বিবেচনায় এ অঞ্চলের জনগণের সরকারি ও নাগরিক সেবা গ্রহণ দীর্ঘসূত্রতা, সময়ক্ষেপণ ও নানা ভোগান্তির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশেষ করে স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা, ভূমি-সংক্রান্ত জটিলতা, আইনশৃঙ্খলা, স্থানীয় সরকার এবং প্রশাসনিক বহুমাত্রিক সেবা গ্রহণের ক্ষেত্রে দূরত্ব একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিবন্ধকতা। প্রতিকূল ও দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ার সময় এই ভোগান্তি আরও প্রকট হয়ে ওঠে। এ অবস্থায় জনগণের নাগরিক অধিকার ও সরকারি সেবায় প্রবেশগম্যতা সহজতর করার লক্ষ্যে ভৌগোলিক অবস্থান, জনসংখ্যা, যোগাযোগব্যবস্থা এবং ফরিদগঞ্জ উপজেলা সদর থেকে দূরত্ব বিবেচনায় একটি নতুন উপজেলা প্রতিষ্ঠার যৌক্তিকতা গুরুত্বের সঙ্গে পর্যালোচনা করা প্রয়োজন। প্রস্তাবিত নতুন উপজেলায় পূর্ব ও পশ্চিম সুবিদপুর ইউনিয়নের পাশাপাশি গুপ্টি, পাইকপাড়া, বালিথুবাসহ মোট ৮টি ইউনিয়ন অন্তর্ভুক্ত করার প্রস্তাব করা হচ্ছে। আমার জন্মগ্রাম পূর্ব সুবিদপুর ইউনিয়নের ‘সুবিদপুর’ গ্রামের অধিবাসীদের দীর্ঘদিনের নাগরিক ভোগান্তির বাস্তব চিত্র একজন সচেতন অধিবাসী হিসেবে পর্যালোচনা করে প্রস্তাবিত নতুন উপজেলার নাম হিসেবে আমি ‘সুবিদপুর উপজেলা’ নামটি প্রস্তাব করছি। কেন সুবিদপুর উপজেলা? প্রস্তাবিত নতুন উপজেলা বাস্তবায়িত হলে বর্তমান ফরিদগঞ্জ উপজেলার অবশিষ্ট ৮টি ইউনিয়ন—গোবিন্দপুর (উত্তর), গোবিন্দপুর (দক্ষিণ), চরদুঃখিয়া (পূর্ব), চরদুঃখিয়া (পশ্চিম), ফরিদগঞ্জ (উত্তর), ফরিদগঞ্জ (দক্ষিণ), রূপসা (উত্তর) ও রূপসা (দক্ষিণ)—এর জনগণের ওপর উপজেলা প্রশাসনিক সেবার চাপ কমবে এবং একই সঙ্গে উভয় অঞ্চলের মানুষের সরকারি সেবা গ্রহণ আরও সহজ, দ্রুত ও কার্যকর হবে। অন্যদিকে প্রস্তাবিত ৮টি ইউনিয়নের অধিবাসীরা উপজেলা-কেন্দ্রিক নাগরিক সেবার আওতায় কম সময়ে, কম ব্যয়ে এবং কম ভোগান্তিতে প্রয়োজনীয় সরকারি ও প্রশাসনিক সেবা পাওয়ার সুযোগ লাভ করবেন। অতএব, ‘সুবিদপুর উপজেলা’ প্রতিষ্ঠা কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর স্বার্থের বিষয় নয়; এটি জনগণের নাগরিক অধিকার, সেবাপ্রাপ্তির সহজতা এবং জনদুর্ভোগ লাঘবের একটি যৌক্তিক দাবি। এই দাবিকে বাস্তব ও জনমুখী উদ্যোগে পরিণত করতে ফরিদগঞ্জ উপজেলার সর্বস্তরের জনগণের স্বতঃস্ফূর্ত সমর্থন, মতামত, ঐক্য ও সহযোগিতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ‘সুবিদপুর উপজেলা বাস্তবায়ন উদ্যোগ’ জনদুর্ভোগ লাঘব, নাগরিক মতামত সংগ্রহ এবং সংশ্লিষ্ট মহলের সঙ্গে গঠনমূলক সংলাপের মাধ্যমে এই যৌক্তিক দাবি বাস্তবায়নের লক্ষ্যে একটি নাগরিক অধিপরামর্শ কেন্দ্র হিসেবে কাজ করতে অঙ্গীকারবদ্ধ। স্থানীয় সরকারের নাগরিক সেবা আরও সহজ, কার্যকর, সময়োপযোগী ও জনমুখী করার লক্ষ্যে এবং ফরিদগঞ্জ উপজেলার ১৬টি ইউনিয়নের জনগণের সেবাপ্রাপ্তির সুযোগ আরও সুসংগঠিত করতে—বাস্তবায়ন করা হোক প্রস্তাবিত ‘সুবিদপুর উপজেলা’। এ বিষয়ে নীতিগত সিদ্ধান্ত গ্রহণ এখন সময়ের দাবি। সংশ্লিষ্ট সরকারি কর্তৃপক্ষ, জনপ্রতিনিধি, রাজনৈতিক ও সামাজিক নেতৃত্ব এবং সর্বস্তরের জনগণের ঐকান্তিক সমর্থন ও সহযোগিতা প্রত্যাশা করছি। বিনীত সম্ভাষণসহ— প্রস্তাবক :  মোস্তফা কামাল যাত্রা আব্বাস আলী পাটওয়ারী বাড়ি, সুবিদপুর, ফরিদগঞ্জ, চাঁদপুর।  নির্বাহী পরিচালক, ইউনাইট থিয়েটার ফর সোশ্যাল অ্যাকশন (উৎস / UTSA)।  শিক্ষক, নাট্যকলা বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়, চট্টগ্রাম। 

আজকের সংবাদ, ফরিদগঞ্জ, সর্বশেষ

ফরিদগঞ্জে ‎গৃহ নির্মাণ সামগ্রী উপহার দিলো জামায়াতে ইসলামী

‎ফরিদগঞ্জ টাইমস ডেস্ক :  ‎চাঁদপুরের ফরিদগঞ্জে অসহায় ও দরিদ্র মানুষের পাশে দাঁড়ানোর লক্ষ্যে গৃহ নির্মাণ সামগ্রী উপহার প্রদান করা হয়েছে। এ উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে মানবসেবা, শান্তি, ঐক্য ও সুস্থ সাংস্কৃতিক বিকাশের প্রত্যয়ে স্থানীয় নেতৃবৃন্দ ও গণ্যমান্য ব্যক্তিরা উপস্থিত ছিলেন। ‎অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী চাঁদপুর জেলা শাখার আমীর মাওলানা বিল্লাল হোসেন মিয়াজী। বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ঢাকা মহানগর দক্ষিণ হাজারীবাগ থানা বিএনপির যুগ্ম-আহ্বায়ক মিজানুর রহমান মিজান, সহকারী সেক্রেটারি অধ্যক্ষ হারুন আর-রশিদ, ফরিদগঞ্জ উপজেলা জামায়াতের আমীর মাওলানা ইউনূছ হেলাল, উপজেলা জামায়াতের সেক্রেটারি ও জামায়াত মনোনীত চেয়ারম্যান প্রার্থী সাখাওয়াত হোসেন। ‎এছাড়া ১৪নং ইউনিয়ন জামায়াতের সভাপতি আবু হানিফ, সেক্রেটারি আমীর হোসেন কামাল, হাবিব উল্লাহ ভূঁইয়া, আনোয়ার হোসেন সবুজ-সহ স্থানীয় জামায়াতের নেতৃবৃন্দ ও গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ উপস্থিত ছিলেন।  ‎অনুষ্ঠানে অসহায় পরিবারের গৃহ নির্মাণে সহায়তার জন্য ঢেউটিনসহ প্রয়োজনীয় গৃহ নির্মাণ সামগ্রী উপহার দেওয়া হয়।  এসময় বক্তারা বলেন, সমাজের অসহায় ও সুবিধাবঞ্চিত মানুষের পাশে দাঁড়ানো প্রত্যেকের নৈতিক দায়িত্ব। মানবিক সহায়তার মাধ্যমে একটি সুন্দর, শান্তিপূর্ণ ও বৈষম্যহীন সমাজ গড়ে তোলার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন তারা। 

আজকের সংবাদ, ফিচার, স্বাস্থ্য

নার্সিসিস্টিক প্যারেন্টিং: যখন সন্তান বেড়ে ওঠে বাবা-মায়ের ছায়া হয়ে 

নাজজেদা নাহার :  প্রতিটি শিশুর প্রথম আয়না তার বাবা-মা। সেই আয়নায় সে নিজেকে দেখে শেখে—আমি কে, আমার কতটা মূল্য আছে, আমাকে ভালোবাসা যায় কী না। কিন্তু কিছু বাবা-মায়ের কাছে এই আয়নাটা উল্টো দিকে ফেরানো থাকে—সেখানে সন্তান নিজেকে দেখে না, বরং প্রতিফলিত হয় বাবা-মায়ের নিজস্ব প্রয়োজন, ইমেজ আর অহংকার। মনোবিজ্ঞানের ভাষায় একে বলে নার্সিসিস্টিক প্যারেন্টিং—এমন এক লালন-পালনের ধরন; যেখানে সন্তানকে দেখা হয় স্বতন্ত্র মানুষ হিসেবে নয়, বরং বাবা-মায়ের নিজস্ব চাহিদা পূরণের মাধ্যম হিসেবে। এখানে ভালোবাসা প্রায়ই শর্তসাপেক্ষ থাকে—সন্তান যখন বাবা-মায়ের প্রত্যাশা মেটায়, তখনই মেলে স্বীকৃতি; ব্যর্থ হলে জোটে উপেক্ষা বা সমালোচনা। Psychology Today-র কমিউনিকেশন বিশেষজ্ঞ প্রেস্টন নি এই ধরনের বাবা-মাকে বর্ণনা করেছেন এমন একজন হিসেবে, যিনি সন্তানের মাধ্যমে নিজের জীবন যাপন করেন, সন্তানের ওপর মালিকানাসুলভ মনোভাব পোষণ করেন, এমনকি নিজের সন্তানের সঙ্গেই এক ধরনের প্রচ্ছন্ন প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হন। গবেষণা যা বলছে: সমস্যাটা আসে কোথা থেকে  নার্সিসিজম আসলে একটি ব্যক্তিত্ব-বৈশিষ্ট্যের ধারাবাহিকতা (spectrum)—একপ্রান্তে থাকে স্বাভাবিক, সুস্থ আত্মবিশ্বাস, আর চরম প্রান্তে থাকে নার্সিসিস্টিক পার্সোনালিটি ডিসঅর্ডার (NPD), যা একটি স্বীকৃত ক্লিনিক্যাল মানসিক স্বাস্থ্য-সমস্যা। একজন বাবা-মা এই স্পেকট্রামের যেখানেই থাকুন না কেন, তাঁর সন্তানের ওপর প্রভাব পড়তে পারে। আর এই প্রবণতা কেবল প্যারেন্টিং থেকেই আসে না—গবেষণা বলছে, কিছু শিশু জন্মগতভাবেই বেশি সংবেদনশীল বা আবেগীয়ভাবে তীব্র প্রতিক্রিয়াশীল হয়, এবং শৈশবের ট্রমা বা অস্থিতিশীল পরিবেশও এই ঝুঁকি বাড়াতে পারে। সহজ ভাষায়, জৈবিক প্রবণতা ও পারিবারিক অভিজ্ঞতা—দুটো মিলেই নার্সিসিস্টিক প্যাটার্ন গড়ে ওঠে। এই বিষয়ে দীর্ঘদিন দুটি প্রতিদ্বন্দ্বী তত্ত্ব চলে আসছিল। একদল মনোবিজ্ঞানী মনে করতেন, বাবা-মায়ের অতিরিক্ত প্রশংসা বা অতিমূল্যায়নই (overvaluation) সন্তানকে নার্সিসিস্ট বানায়। আরেকদলের যুক্তি ছিল ঠিক উল্টো—ভালোবাসার উষ্ণতার অভাবই এই প্রবণতার জন্ম দেয়। ২০১৫ সালে নেদারল্যান্ডসের গবেষক এডি ব্রুমেলম্যান ও তাঁর সহকর্মীরা ৫৬৫টি শিশু ও তাদের বাবা-মায়ের ওপর দেড় বছর ধরে চালানো একটি দীর্ঘমেয়াদি গবেষণায় (PNAS) এই বিতর্কের অনেকটাই মীমাংসা করে দেন। ফলাফল স্পষ্টভাবে প্রথম তত্ত্বের পক্ষে যায়—শিশু নার্সিসিস্ট হয়ে ওঠে বাবা-মায়ের অতিরঞ্জিত মূল্যায়ন আত্মস্থ করার মধ্য দিয়ে, ভালোবাসার অভাব থেকে নয়। “আমি অন্যদের চেয়ে শ্রেষ্ঠ”, “আমার বিশেষ সুবিধা পাওয়ার অধিকার আছে”—এই ধরনের বার্তা শিশু বিশ্বাস করতে শুরু করে যখন বাবা-মা বারবার তাকে ‘অসাধারণ’ বলে চিহ্নিত করেন। এই গবেষণারই একজন সহ-লেখক, মনোবিজ্ঞানী ব্র্যাড বুশম্যান পরে মন্তব্য করেছিলেন, শিশুরা বিশ্বাস করে বাবা-মা যখন বলেন তারা অন্যদের চেয়ে বিশেষ—আর এটা তাদের জন্য বা সমাজের জন্য মোটেও ভালো ফল বয়ে আনে না। আকর্ষণীয় বিষয় হলো, গবেষণায় দেখা গেছে সন্তানের প্রকৃত আত্মসম্মানবোধ (self-esteem) গড়ে ওঠে বাবা-মায়ের উষ্ণতা থেকে, অতিমূল্যায়ন থেকে নয়। অর্থাৎ, প্রশংসা আর ভালোবাসা এক জিনিস নয়—আর এই পার্থক্যটা বোঝা নার্সিসিস্টিক প্যারেন্টিং চেনার প্রথম চাবিকাঠি।  চেনার উপায়: কিছু পুনরাবৃত্ত প্যাটার্ন  ক্লিনিক্যাল সাইকোলজিস্ট মেরি অ্যান লিটল তাঁর Childhood Narcissism বইয়ে এবং Psychology Today-তে প্রকাশিত একাধিক নিবন্ধে লিখেছেন, নার্সিসিস্টরা কাঠামোগতভাবেই ‘যথেষ্ট ভালো’ বাবা-মা হওয়ার সক্ষমতা রাখেন না—কারণ তাঁদের মনোযোগ মূলত নিজের দিকেই ফেরানো থাকে। সন্তানের প্রায় অফুরন্ত মনোযোগ ও স্নেহের প্রয়োজন হলেও এই বাবা-মায়ের কাছে দেওয়ার মতো আবেগীয় শক্তি অবশিষ্ট থাকে না। ২০২৩ সালে প্রকাশিত তিনটি আন্তর্জাতিক গবেষণা—Lyons ও সহকর্মীদের, Hoxhaj-এর এবং Torres-এর—পৃথকভাবে একই সিদ্ধান্তে পৌঁছেছে: নার্সিসিস্টিক বাবা-মায়ের সন্তান হওয়ার অভিজ্ঞতা আত্মমূল্যবোধ, সংযুক্তি-শৈলী, রোমান্টিক সম্পর্ক ও আবেগীয় স্থিতিশীলতার ওপর স্বীকৃত ও শনাক্তযোগ্য প্রভাব ফেলে। এমনকি নার্সিসিজম এক প্রজন্ম থেকে পরের প্রজন্মে সঞ্চারিত হওয়ারও প্রমাণ মিলেছে। এই প্যারেন্টিংয়ের বৈশিষ্ট্যগুলো আলাদা আলাদাভাবে দেখলে হয়তো তেমন উদ্বেগজনক মনে হয় না, কিন্তু একসঙ্গে দেখলে একটা স্পষ্ট প্যাটার্ন ধরা পড়ে। প্রথমত, সন্তান যদি অসাধারণ প্রতিভাবান হয়, তাহলে তাকে বাবা-মায়ের নিজস্ব গৌরবের সম্প্রসারণ বানিয়ে ফেলা হয়—আর হতাশ করলে জোটে কঠোর প্রত্যাখ্যান। দ্বিতীয়ত, শিশুসুলভ স্বাভাবিক দুষ্টুমি বা ভুলকেও এই বাবা-মায়েরা ব্যক্তিগত অপমান হিসেবে নেন, কারণ তাঁরা মনে করেন এতে তাঁদের নিজেদের ভাবমূর্তি নষ্ট হচ্ছে—ফলে সন্তান শেখে নিখুঁত হওয়ার চাপ, নয়তো লজ্জাবোধ। তৃতীয়ত, অতিরিক্ত নিয়ন্ত্রণ, নির্দেশনা আর সমালোচনার মধ্য দিয়ে সন্তানের নিজে সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ কেড়ে নেওয়া হয়, যার ফলে আত্মবিশ্বাস ধীরে বিকশিত হয়। আর সবচেয়ে গভীর ক্ষতটা হয়তো এখানেই—এই বাবা-মায়েরা সন্তানকে যেমন সে ঠিক তেমনভাবে ভালোবাসতে পারেন না; তাঁরা ভালোবাসেন কল্পিত, আদর্শ সন্তানকে।  শর্তসাপেক্ষ এই ভালোবাসা থেকে জন্ম নেয় গভীর এক অনুভূতি—আমি হয়তো ভালোবাসার যোগ্যই নই। সন্তান বড় হয়ে নিজের পথ বেছে নিতে শুরু করলে সমস্যাটা আরও প্রকট হয়ে ওঠে। প্রেস্টন নি লক্ষ্য করেছেন, শিক্ষাগত-পেশাগত পথ বাছাই থেকে শুরু করে নিজস্ব বন্ধু বা জীবনসঙ্গী বেছে নেওয়া পর্যন্ত—স্বাতন্ত্র্যের প্রতিটি প্রকাশকে দেখা হয় ব্যক্তিগত আক্রমণ হিসেবে। সন্তানের জীবনে রোমান্টিক সঙ্গীর আগমন প্রায়ই বড় হুমকি হিসেবে বিবেচিত হয়, কারণ তা বাবা-মায়ের নিয়ন্ত্রণের বৃত্ত ভাঙার ইঙ্গিত দেয়। আমাদের প্রেক্ষাপটে একটি পর্যবেক্ষণ: বাংলাদেশের মতো সমাজে, যেখানে ‘পারিবারিক সম্মান’ ও ‘লোকে কী বলবে’—এই মানদণ্ডে সন্তান গড়ে তোলা হয়, সেখানে এই প্যাটার্নগুলো অনেক সময় স্বাভাবিক অভিভাবকত্ব হিসেবেই ধরা পড়ে না। সন্তানের রেজাল্ট বা চাকরিকে ‘আত্মীয়স্বজনকে গর্ব করে বলার মতো’ বিষয় বানিয়ে ফেলা, নিজের পছন্দে বিয়ে বা ক্যারিয়ার বেছে নিলে ‘তুই আমাদের মুখ রাখলি না’ বলে অপরাধবোধ চাপিয়ে দেওয়া, কিংবা সন্তানের আবেগ প্রকাশকে ‘বেয়াদবি’ বা ‘অকৃতজ্ঞতা’ বলে থামিয়ে দেওয়া—এসব এতটাই পরিচিত দৃশ্য যে অনেকে বড় হয়েও বোঝেন না তাঁদের অভিজ্ঞতার একটা নাম আছে।  যখন সন্তান বড় হয়  শৈশবের এই অভিজ্ঞতা প্রাপ্তবয়স্ক জীবনেও রয়ে যায়, রূপ পাল্টে। যাঁরা নার্সিসিস্টিক বাবা-মায়ের সন্তান, তাদের মধ্যে প্রায়ই দেখা যায় নিম্ন আত্মমূল্যবোধ, বিষণ্নতা, এমনকি জটিল PTSD-র লক্ষণ। এর কারণ খুঁজতে গেলে ফিরে যেতে হয় শৈশবেই—যেখানে সন্তান শিখেছিল নিজের আবেগীয় প্রয়োজন চেপে রাখতে, কারণ স্বীকৃতি নির্ভর করত তার পারফরম্যান্স বা অর্জনের ওপর। এই শেখা প্রাপ্তবয়স্ক জীবনে রূপ নেয় এক ধরনের ভেতরের শূন্যতায়, যা প্রায়ই ব্যাখ্যাতীত থেকে যায়। নিয়ন্ত্রণও থামে না বড় হওয়ার পর। থেরাপিস্ট জেনিফার ফ্রিডি ও তাঁর সহলেখকের একটি নিবন্ধ অনুযায়ী, নার্সিসিস্টিক বাবা-মায়েরা প্রায়ই প্রাপ্তবয়স্ক সন্তানকেও গ্যাসলাইট করে চলেন—পুরনো নিয়ন্ত্রণের ধরনে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করেন। এই জটিল সম্পর্কগুলো উদ্বেগ, বিষণ্নতা, বিভ্রান্তি, অসহায়ত্ব, ক্রোধ, ক্লান্তি আর গভীর শোকের এক অন্তহীন চক্র তৈরি করতে পারে। তবে ভালো খবরও আছে—ট্রমা-সংবেদনশীল ও সংযুক্তি-কেন্দ্রিক থেরাপি এই চক্র ভাঙতে কার্যকরভাবে সাহায্য করতে পারে। আরেকটি সাধারণ প্রবণতা হলো সম্পর্কের একটি ত্রুটিপূর্ণ মডেল বহন করা। নার্সিসিস্টিক বাড়িতে বড় হওয়া সন্তান প্রায়ই ‘ঊর্ধ্ব-নিম্ন’ ধরনের সম্পর্ককেই স্বাভাবিক বলে ধরে নেয়—কারণ ছোটবেলা থেকে সে নিজেই বাবা-মায়ের আবেগীয় প্রয়োজন মেটানোর ভূমিকায় অভ্যস্ত। এই প্যাটার্ন অজান্তেই পরবর্তী জীবনের বন্ধুত্ব, প্রেম এমনকি কর্মক্ষেত্রের সম্পর্কেও প্রতিফলিত হতে থাকে—কখনো নিজেকে বারবার নিয়ন্ত্রণকারী সঙ্গীর কাছে খুঁজে পাওয়া, কখনো বা নিজের ভেতরেই বাবা-মায়ের কিছু আচরণের প্রতিচ্ছবি আবিষ্কার করা। (এখানে ব্যবহৃত ‘জটিল PTSD’, ‘গ্যাসলাইট’, ‘নার্সিসিস্টিক পার্সোনালিটি ডিসঅর্ডার’ ইত্যাদি পরিভাষা শিক্ষামূলক উদ্দেশ্যে ব্যবহৃত—এগুলো কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তি বা সম্পর্কের ক্লিনিক্যাল নির্ণয় নয়। কারো আচরণ এসব মাপকাঠিতে পড়ে কী না, তা কেবল একজন প্রশিক্ষিত মানসিক স্বাস্থ্য পেশাদারই নির্ধারণ করতে পারেন।) ক্ষতির ভেতরেও যা বেঁচে থাকে  তবে এই গল্প শুধুই ক্ষতির নয়। মনোবিজ্ঞানী চিকি ডেভিস একটি গুরুত্বপূর্ণ ও প্রায়ই উপেক্ষিত দিক তুলে ধরেছেন—নার্সিসিস্টিক বাবা-মায়ের সন্তানেরা

Scroll to Top