লামিয়া ইউছুফ :
কথাসাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদের ‘ফেরা’ উপন্যাসটি তাঁর চেনা ধাঁচের অন্যান্য রচনাগুলোর চেয়ে বেশ আলাদা। লেখকের নানার বাড়ি নেত্রকোনার মোহনগঞ্জের ‘সোহাগী’ গ্রামকে কেন্দ্র করে এই উপন্যাসের গল্পটি আবর্তিত হয়েছে। এটি মূলত ভাটি অঞ্চলের মানুষের জীবনের চিরন্তন টানাপোড়েন ও জলজীবনের গল্প।
উপন্যাসের অন্যতম ট্রাজিক ও হৃদয়বিদারক দিক ফুটে ওঠে পিতা-পুত্রের সম্পর্কের এক চরম ভাঙন এবং পারিবারিক সংকটের মধ্য দিয়ে। মতি মিয়ার বড় ছেলে আজফর হাড়ভাঙা খাটুনি খেটে অনেক কষ্ট করে কিছু টাকা জমিয়েছিল। কিন্তু জন্মদাতা পিতা হয়েও মতি মিয়া নিজের ছেলের সেই কষ্টার্জিত টাকা চুরি করে কাউকে কিছু না জানিয়ে হুট করেই গ্রাম ছেড়ে পালিয়ে যায়। মতি মিয়ার এই আকস্মিক প্রস্থান ও নিজ সন্তানের সাথে এমন চরম বিশ্বাসঘাতকতার পর তার স্ত্রী এবং পুরো পরিবারটি এক ঘোর অনিশ্চয়তা ও কষ্টের সাগরে পড়ে হাবুডুবু খেতে থাকে।
পারিবারিক এই সংকটের সমান্তরালে বইটিতে গ্রামবাংলার সংস্কৃতি, কুসংস্কার, বহুবিবাহ, তাবিজ-কবজের প্রভাব এবং বিশেষ করে ধীবর বা কৈবর্ত সম্প্রদায়ের জীবনের সংগ্রাম অত্যন্ত নিখুঁতভাবে ফুটে উঠেছে। গ্রামীণ সহজ-সরল মানুষের একে অপরের বিপদে ছুটে যাওয়ার যে চিরন্তন রূপ, তা এখানে দারুণভাবে দেখানো হয়েছে। সেই সাথে, একজন মফস্বল বা গ্রাম্য ডাক্তারের সাথে শহরের ডিগ্রিধারী চিকিৎসকদের যে মানসিক দূরত্ব ও পেশাগত দ্বন্দ্ব থাকে, তাও গল্পে চমৎকারভাবে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। বিশেষ করে গ্রামীণ চিকিৎসক আমিন ডাক্তারের ভূমিকা এখানে অনন্য। তিনি নুরার মাছ নিয়ে যাওয়ার প্রতিবাদের জন্য যে ১১ বছর হাজতবাস করেছেন, তা সবচেয়ে হৃদয়-বিদারক। অন্যদিকে জমিদারের ছোট পাগলা ছেলের চিকিৎসার জন্য নীলগঞ্জে যাওয়ার আকুতি। আর নুরুদ্দীনের চোখে অবাস্তব ‘জলকন্যা’ দেখার অবোধ লোকবিশ্বাস ভাটি অঞ্চলের মানুষের মনস্তত্ত্বকে দারুণভাবে স্পর্শ করে।
কাহিনির মূল মোড় ঘোরে যখন দীর্ঘ বছর পর, সংসারের পরিস্থিতি সম্পূর্ণ বদলে যাওয়ার পর মতি মিয়া আচমকা আবার গ্রামে ফিরে আসে। কিন্তু নিজের ছেলের টাকা চুরি করার পাপের বোঝা আর দীর্ঘ অনুপস্থিতির কারণে এই ফিরে আসা আগের মতো সহজ হয় না। তার স্ত্রী, সন্তান আজফর, নুরুদ্দিন এবং প্রতিবেশীদের মানসিকতা ততদিনে বদলে গেছে, যার ফলে সে নিজের ঘরেই প্রায় এক অচেনা ব্যক্তিতে পরিণত হয়। হুমায়ূন আহমেদ এই উপন্যাসে দেখিয়েছেন যে, সময়ের ব্যবধান কীভাবে মানুষের সম্পর্ক ও আবেগকে বদলে দেয় এবং মানুষ চাইলেই পুরোনো জীবনে সহজে ‘ফিরে’ যেতে পারে না।
উপন্যাসটিতে নিখুঁত ও খাঁটি আঞ্চলিক ভাষার ব্যবহার এর অন্যতম বড় আকর্ষণ, যা বইটির শেষে একটি নির্ঘণ্ট আকারেও যুক্ত করা হয়েছে। ১১২ পৃষ্ঠার ছোট কলেবরের এই উপন্যাসটি এক বসায় পড়ে শেষ করার মতো। যারা গ্রামবাংলার সংস্কৃতি, ইতিহাস এবং গ্রামীণ জনজীবন সম্পর্কে জানতে আগ্রহী, তাদের জন্য এই উপন্যাসটি একটি অনবদ্য ও শ্রেষ্ঠ সৃষ্টি।
