২৯শে অক্টোবর, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ

কেএম নজরুল ইসলাম :

আমার কিছু ভাই সম্ভবত মূলধারার সাংবাদিকতাকে ঠিকভাবে বুঝতে পারছেন না। তারা হয়তো মনে করছেন, সাংবাদিকতা হাসিঠাট্টার কোনো বিষয়, খেলারঙের ঢংয়ে চলা কোনো খেলা! অথচ সাংবাদিকতা কোনো খেলা নয়, কোনো পক্ষের হয়ে স্লোগান দেওয়ার মঞ্চও নয়। এটি দায়িত্বের জায়গা, বিবেকের জায়গা, সত্যকে তুলে ধরার জায়গা।

একটি সংবাদ, একটি শিরোনাম কিংবা সাংবাদিকের লেখা কয়েকটি লাইন অনেক কিছু পাল্টে দিতে পারে। কখনো তা জনমত তৈরি করে, কখনো ক্ষমতাবানদের জবাবদিহির মুখোমুখি করে, আবার কখনো আড়ালে পড়ে থাকা মানুষের কণ্ঠস্বর হয়ে ওঠে। একটি সংবাদ প্রশাসনকে নড়েচড়ে বসতে বাধ্য করতে পারে, একটি প্রতিবেদন অনিয়মের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার পথ তৈরি করতে পারে। এটাই সাংবাদিকতার শক্তি। আর এই শক্তির সঙ্গে জড়িয়ে আছে বিশাল দায়িত্ব।

তবে হ্যাঁ, এটাও অস্বীকার করার উপায় নেই যে গুটিকয়েক সাংবাদিকের কর্মকাণ্ডের কারণে পুরো সাংবাদিক সমাজকে কথা শুনতে হচ্ছে। মানুষের প্রশ্নের মুখে পড়তে হচ্ছে, সমালোচনা সহ্য করতে হচ্ছে। এর দায় একেবারে অন্যের ওপর চাপিয়ে দিয়ে লাভ নেই। সাংবাদিকতার পরিচয় ব্যবহার করে কেউ যদি ব্যক্তিস্বার্থ হাসিল করেন, রাজনৈতিক সুবিধা নেন কিংবা সত্যকে আড়াল করে নিজের পছন্দের পক্ষকে সুবিধা দিতে চান, তাহলে তার দায় শেষ পর্যন্ত পুরো পেশার ভাবমূর্তিতেই আঘাত করে। ‘মুই কী হনু রে’—ভাবকে ত্যাগ করা উচিত আমাদের। 

এই পরিস্থিতি একদিনে তৈরি হয়নি। আমাদের মধ্য থেকেই কেউ কেউ অন্যকে সেই সুযোগ করে দিয়েছেন। তাই আজ যখন সাংবাদিকতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে, যখন সংবাদকর্মীদের বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে কথা হয়, তখন শুধু ক্ষোভ প্রকাশ করলেই হবে না। আত্মসমালোচনাও করতে হবে। সংবাদকর্মী হিসেবে আমি নিজে কতটা সৎ, কতটা নিরপেক্ষ, কতটা দায়িত্বশীল—সেই প্রশ্নটা আগে নিজের কাছেই রাখা জরুরি।

আমি কি সংবাদ প্রকাশের ক্ষেত্রে সত্যকে প্রাধান্য দিচ্ছি? আমি কি ব্যক্তিগত পছন্দ-অপছন্দের ঊর্ধ্বে উঠতে পারছি? আমার কলম কি সাধারণ মানুষের পক্ষে কথা বলছে, নাকি কোনো ব্যক্তি কিংবা গোষ্ঠীর স্বার্থ রক্ষা করছে? আমি কি সংবাদ পরিবেশন করছি, নাকি নিজের অবস্থানকে সংবাদ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে চাইছি?

প্রশ্নগুলো কঠিন, কিন্তু জরুরি। কারণ, অন্যের সমালোচনা করার আগে নিজের আয়নাটা পরিষ্কার রাখা প্রয়োজন। আমরা নিজেরা যদি পেশার ন্যূনতম নীতি ও মর্যাদা রক্ষা করতে ব্যর্থ হই, তাহলে অন্যের কাছে সেই মর্যাদা দাবি করব কীভাবে? ফরিদগঞ্জ প্রেসক্লাবের পক্ষ থেকে যে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে ফরিদগঞ্জ উপজেলা বিএনপির নিউজ বর্জনের, আমি মনে করি এটা ঠিকই আছে। কারণ, আমার সহকর্মী লাঞ্ছিত হয়েছে, হুমকি-ধমকির শিকার হয়েছে। এটা আর বাড়তে দেওয়া ঠিক নয়। সারাদেশের সংবাদকর্মীদের দিকে তাকালে আমি দেখতে পাই দুর্দশার চিত্র। সবখানেই লাঞ্ছিত হচ্ছে আমাদের সহকর্মীরা। কার দ্বারা লাঞ্ছিত হচ্ছে? প্রশ্নের উত্তর আপনাদের কাছেই আছে। আমরা সবাই বুদ্ধিমান, সাংবাদিকদের চেয়ে বুদ্ধিমান আমার রাজনৈতিক বন্ধুরা। 

রাজনীতি মূলত ক্ষমতা অর্জন, রাষ্ট্র পরিচালনা কিংবা নির্দিষ্ট আদর্শ ও কর্মসূচি বাস্তবায়নের সঙ্গে যুক্ত। অন্যদিকে সাংবাদিকতার দায়িত্ব হলো ক্ষমতাকে প্রশ্ন করা, ঘটনা যাচাই করা, তথ্য তুলে ধরা এবং জনগণকে সত্য জানার সুযোগ করে দেওয়া। রাজনীতিবিদদের নিজস্ব দল, আদর্শ ও রাজনৈতিক অবস্থান থাকতে পারে। কিন্তু একজন পেশাদার সাংবাদিকের কাছে সংবাদ পরিবেশনের ক্ষেত্রে সত্য, তথ্যের নির্ভুলতা ও জনস্বার্থই হওয়া উচিত প্রধান বিবেচ্য। ২০০/৩০০ টাকা দিয়ে আপনারা সাংবাদিক কিনবেন—এতবড় দুঃসাহস নেই। ফরিদগঞ্জ প্রেসক্লাব এমন কোনো সস্তা প্রতিষ্ঠান নয় যে আপনারা ভিখিরি মনে করছেন। যাদের কিনতে পারেন, কিনেন। কিন্তু অনির্দিষ্টকালের জন্য ফরিদগঞ্জ প্রেসক্লাবের কলম চলবে না আপনাদের কল্যাণে। 

কোনো সাংবাদিকের ব্যক্তিগত রাজনৈতিক মতাদর্শ থাকতেই পারে। তিনি নাগরিক হিসেবে কোনো দলকে পছন্দ করতে পারেন, কোনো রাজনৈতিক দর্শনে বিশ্বাস করতে পারেন। কিন্তু সেই পছন্দ যেন তার পেশাগত দায়িত্বকে নিয়ন্ত্রণ না করে। রাজনৈতিক বিশ্বাস আর সাংবাদিকতার দায়িত্ব এক করে ফেললেই সমস্যা তৈরি হয়। তখন সংবাদ আর সংবাদ থাকে না; তা হয়ে ওঠে প্রচারণা, পক্ষপাত কিংবা ব্যক্তিগত অবস্থান প্রতিষ্ঠার হাতিয়ার।

একজন সাংবাদিক কোনো রাজনৈতিক দলের অন্যায়ের সমালোচনা করলে তিনি সেই দলের শত্রু হয়ে যান না। আবার কোনো দলের ভালো কাজের স্বীকৃতি দিলেই তিনি সেই দলের কর্মী হয়ে যান না। সাংবাদিকতার মূল শক্তি এখানেই—প্রশংসা ও সমালোচনা দুটোই হবে তথ্যের ভিত্তিতে, কারও অনুগ্রহ কিংবা বিরাগের কারণে নয়। হুম, কারো কারো পছন্দের দল থাকতে পারে। তবে এক্ষেত্রে অগ্রাধিকার দেওয়া উচিত যেকোনো একটা প্ল্যাটফর্মকে। 

কিন্তু বাস্তবতা হলো, আমরা অনেক সময় সাংবাদিকতার এই মৌলিক জায়গাটি ভুলে যাই। রাজনৈতিক পরিচয়কে পেশাগত পরিচয়ের ওপর বসিয়ে দিই। কে কোন দলের পক্ষে কথা বলছেন, কে কার সমালোচনা করছেন—এসব দিয়ে সাংবাদিকের মূল্যায়ন করতে শুরু করি। এর ফলে সাংবাদিকতার স্বাধীনতা যেমন সংকুচিত হয়, তেমনি সাধারণ মানুষের কাছেও সংবাদমাধ্যমের বিশ্বাসযোগ্যতা প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়ে।

আরেকটি বিষয় মনে রাখা জরুরি—সব সাংবাদিক একরকম নন। কারও অনিয়মের দায় পুরো সাংবাদিক সমাজের ওপর চাপিয়ে দেওয়া যেমন ন্যায়সংগত নয়, তেমনি সাংবাদিক পরিচয় বহন করলেই কেউ সমালোচনার ঊর্ধ্বে উঠে যান না। বরং সাংবাদিকতার পরিচয় যত বড়, জবাবদিহির দায়িত্বও তত বেশি। 

আমাদের সহকর্মীদের প্রতিও তাই আহ্বান— সমালোচনা শুনলেই ক্ষুব্ধ হবেন না। আগে বোঝার চেষ্টা করুন, সমালোচনার পেছনে কোনো বাস্তব কারণ আছে কী না। ভুল হয়ে থাকলে স্বীকার করুন, সংশোধন করুন। আর অভিযোগ ভিত্তিহীন হলে তথ্য ও যুক্তি দিয়ে তার জবাব দিন। পেশার মর্যাদা রক্ষা করতে হলে আত্মপক্ষ সমর্থনের পাশাপাশি আত্মশুদ্ধির মানসিকতাও প্রয়োজন।

একই সঙ্গে যারা সাংবাদিকতাকে তুচ্ছ করে দেখেন, তাদেরও বুঝতে হবে—একটি স্বাধীন ও দায়িত্বশীল সংবাদমাধ্যম সমাজের জন্য কতটা গুরুত্বপূর্ণ। সাংবাদিকতা কারও ব্যক্তিগত প্রতিপক্ষ হওয়ার নাম নয়। এটি জনস্বার্থে প্রশ্ন তোলার অধিকার, অনিয়ম প্রকাশ করার সাহস এবং মানুষের জানার অধিকার প্রতিষ্ঠার একটি মাধ্যম। মনে রাখবেন, মূলধারার গণমাধ্যম আর কনটেন্ট ক্রিয়েটর কখনোই এক নয়; সমান নয়। আপনারা যারা এক মনে করেন, তাদের জ্ঞানের অপ্রতুলতার কাছে আমার মোধাকে বিক্রি করব না। 

আমরা যারা এই পেশায় আছি, তাদের মনে রাখতে হবে—সাংবাদিকতার শক্তি কণ্ঠের উচ্চতায় নয়, তথ্যের সত্যতায়; পরিচয়ের দাপটে নয়, বিশ্বাসযোগ্যতায়; রাজনৈতিক আনুগত্যে নয়, দায়িত্বশীলতায়। আমি কেএম নজরুল ইসলাম খুবই নগণ্য এবং অপরিচিত একজন সাংবাদিক। এমন কোনো বড় সাংবাদিক হইনি যে অহংকার করতে পারি। কিন্তু, আমার অহংকার হচ্ছে: হ্যাঁ, আমি এমন কোনো সংবাদকর্মী নই যে, কোথাও গিয়ে কাউকে জোরপূর্বকভাবে চাপ দিয়ে অর্থ আদায় করেছি। নেই, এমন ব্লেইম বা ক্লেইম নেই ফরিদগঞ্জের সংবাদ জগতে। আমি নিজেকে পরিচিত করার জন্যও এই গণমাধ্যমে আসিনি। আসছি, মানুষের সেবা করতে। আমার কাছে এটা মানবিক কাজ বলেই বিবেচিত। 

দিনশেষে মানুষ আমাদের পদবি কিংবা পরিচয় মনে রাখবে না, মনে রাখবে আমাদের কাজ। আমরা কী লিখেছি, কী প্রকাশ করেছি, কার পক্ষে দাঁড়িয়েছি, আর সত্যের প্রশ্নে কতটা আপসহীন ছিলাম—তার হিসাব একদিন দিতেই হবে।

লেখক: গণমাধ্যমকর্মী

Tags:

সর্বশেষ

Calendar
Mon Tue Wed Thu Fri Sat Sun
 1234
567891011
12131415161718
19202122232425
262728293031  
Scroll to Top