উঠোনের অর্থনীতি: যেখানে শীতল পাটি আর নকশিকাঁথা এক সুতোয় গাঁথা
ফাতেমাতুজ জান্নাত প্রিয়া : চাঁদপুরের ফরিদগঞ্জের কোনো গ্রামে বিকেলবেলায় যদি কোনো বাড়ির উঠোনে উঁকি দেন, এক অদ্ভুত দৃশ্য চোখে পড়বে। বাচ্চারা শুয়ে শুয়ে কৌতূহলী চোখ দিয়ে দেখে হাজারো স্বপ্ন বুননের গল্প। একই উঠোনে দুটি শিল্প পাশাপাশি বেঁচে আছে। এক কোণে শাশুড়ি মুর্তা বেত দিয়ে শীতল পাটি বুনছেন, আর ঠিক তার পাশেই পুত্রবধূ পুরনো শাড়ির ওপর সুই দিয়ে তুলছেন নকশিকাঁথার ফোঁড়। দুটি ভিন্ন শিল্প, কিন্তু একই গল্প—টিকে থাকার গল্প। গ্রামীণ অর্থনীতিতে নারীর ভূমিকা নিয়ে আমরা অনেক কথা বলি, কিন্তু এই উঠোনের দিকে না তাকালে তা বোঝা যাবে না। এখানে শীতল পাটি আর নকশিকাঁথা আলাদা কোনো পণ্য নয়, এরা একে অপরের পরিপূরক। সকালটা পাটির, রাতটা কাঁথার গ্রামের নারীদের দিন ভাগ করা থাকে। ভোর থেকে দুপুর পর্যন্ত চলে শীতলপাটির কাজ। কারণ, পাটি বুনতে লাগে দিনের আলো, টান টান বেত, শক্ত হাত। মুর্তা কাটা, সেদ্ধ করা, শুকানো, রঙ করা—সবটাই তো কায়িক পরিশ্রমের। একজন নারী দিনে ৪-৫ ঘণ্টা কাজ করে একটি পাটির এক-তৃতীয়াংশ শেষ করেন। এটি তার ‘দিনের আয়’। আর সন্ধ্যার পর? যখন হাঁস-মুরগি তুলে, রান্না শেষে ঘরে হারিকেন জ্বলে, তখন কোলে আসে নকশিকাঁথা। এরজন্য জোরে আলো লাগে না, লাগে ধৈর্য। এটা তার ‘রাতের সঞ্চয়’। পাটির টাকা দিয়ে চাল-ডাল কেনা হয়, আর কাঁথার টাকা জমে থাকে মেয়ের বিয়ে কিংবা বিপদের জন্য। রূপসা গ্রামের আমেনা বেগম বলেন, “পাটি হইলো আমার দৈনিক হাজিরা, কাঁথা হইলো আমার ব্যাংক। পাটি না বুনলে চুলা জ্বলবো না, কাঁথা না সেলাইলে ভবিষ্যৎ থাকবো না।” ফেলে দেওয়া থেকে বৈদেশিক মুদ্রা—একই হাতে দুই জাদু এই মিশ্র অর্থনীতির সবচেয়ে সুন্দর দিক হলো এর জিরো ওয়েস্ট মডেল। মুর্তা গাছের যে অংশ দিয়ে পাটি হয় না, সেই সরু অংশ দিয়ে হয় ঝুড়ি, মোড়া। আর নকশিকাঁথা? সেটি তো তৈরি হয় একেবারে ফেলে দেওয়া কাপড় দিয়ে। একটি পরিবারের যে কাপড় আর পরার যোগ্য নয়, তাই হয়ে যায় ৩০০ ডলারের রপ্তানি পণ্য। একজন নারী যখন একই সাথে দুটি কাজ পারেন, তখন বাজারে তার দর কষাকষির ক্ষমতা বাড়ে। পাটি বিক্রি না হলে কাঁথা আছে, কাঁথার অর্ডার না থাকলে পাটি আছে। গ্রামীণ অর্থনীতিতে একে বলে ‘ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা’, যা বড় বড় অর্থনীতিবিদরা এসি রুমে বসে শেখান, আর আমাদের মায়েরা উঠোনে বসে করে দেখান। আজ ঢাকার গুলশানের শোরুমে যে শীতল পাটির টেবিল ম্যাট ২৫০০ টাকা, আর যে নকশিকাঁথার বেড কভার ১২,০০০ টাকা—তার কারিগর একই গ্রামের দুই বোন, কিংবা একই মায়ের দুই রূপ। কিন্তু এই সোনার হাতগুলোই সবচেয়ে অবহেলিত। ফড়িয়া এসে বলে, “চাচী, পাটি আর কাঁথা দুইটাই একসাথে দেন, দাম একটু কম রাখেন।” আলাদা আলাদা বিক্রি করলে যে টাকা পেতেন, একসাথে মিক্স করে বিক্রি করতে গিয়ে ৩০% কম পান। তাই সময় এসেছে এই ‘মিক্সড ইকোনমি’-কে আলাদা চোখে দেখার। সরকার যদি ‘এক উঠোন, দুই শিল্প’ মডেলে একটি সমবায় করে দেয়—যেখানে নারীরা নিজেদের পাটি ও কাঁথা একসাথে প্রদর্শন ও বিক্রি করতে পারবেন, সরাসরি অনলাইনে ছবি তুলে ক্রেতা খুঁজবেন, তাহলে মধ্যস্বত্বভোগী থাকবে না। শীতল পাটি শরীরকে শীতল করে, নকশিকাঁথা বুকে উষ্ণতা দেয়। একটি গ্রামীণ নারী এই দুইয়ের কারিগর হয়ে প্রমাণ করছেন—তিনি শুধু ঘর সামলান না, তিনি দেশের অর্থনীতির তাপমাত্রাও নিয়ন্ত্রণ করেন। তার উঠোনটাই আসলে বাংলাদেশের সবচেয়ে ছোট, কিন্তু সবচেয়ে শক্তিশালী ব্যাংক।


