২৮শে অক্টোবর, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ

অক্টোবর ৯, ২০২৬

আজকের সংবাদ, সর্বশেষ

কুমারখালীতে গভীর রাতে শতবর্ষী মন্দিরের ৪ প্রতিমা ভাঙচুরের অভিযোগ

ফরিদগঞ্জ টাইমস ডেস্ক :  কুষ্টিয়ার কুমারখালীতে শতবর্ষী মন্দিরের গণেশ, লক্ষ্মী, সিংহসহ অন্তত চারটি প্রতিমা ভাঙচুরের অভিযোগ উঠেছে দুর্বৃত্তদের বিরুদ্ধে। বৃহস্পতিবার গভীর রাতে পৌরসভার ৯নং ওয়ার্ডের খয়েরচারা মাতৃ সার্বজনীন পূজা মন্দিরে এ ঘটনা ঘটে। শুক্রবার (৯ অক্টোবর) সকালে বিষয়টি জানাজানি হলে প্রশাসন, পুলিশ, পূজা উদযাপন পরিষদের নেতা ও উৎসুক জনতা ভিড় করেন। পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, খয়েরচারা মাতৃমন্দিরে দুর্গাপূজা উপলক্ষে প্রতিমা তৈরির কাজ চলছিল। বৃহস্পতিবার দিবাগত রাত ২টার দিকে কাজ শেষ করেন কারিগর অধীর বিশ্বাস। এসময় তার সঙ্গে মন্দিরের সাধারণ সম্পাদক কৌশিক বিশ্বাসসহ আরও কয়েকজন ছিলেন। এরপর সকাল ৬টার দিকে মন্দির কমিটির লোকজন দেখতে পান মন্দিরের বাঁশের বেড়া ভাঙা। ভেতরে গণেশ, লক্ষ্মী, সিংহসহ চারটি প্রতিমায় ভাঙচুরের ক্ষত। সেখানে নেই সিসিটিভি কিংবা নিরাপত্তা বলয়। মন্দির কমিটির সাধারণ সম্পাদক কৌশিক বিশ্বাস বলেন, “রাত ২টার দিকে কাজ শেষে সবাই বাড়ি চলে যায়। সকাল ৬টার দিকে এসে দেখি গণেশ, লক্ষ্মী, সিংহসহ চারটি প্রতিমা ভাঙা। আর্থিক সংকটের কারণে এখনও সিসিটিভি স্থাপন করা হয়নি। পূর্বশত্রুতার জেরে কেউ হামলা চালিয়েছে। আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।” উপজেলা পূজা উদযাপন পরিষদের সাধারণ সম্পাদক আইনজীবী শংকর মজুমদার বলেন, “সমাজের মধ্যে এক ধরনের অসুর রয়েছে। তারা উৎসব বিঘ্নিত করতে এবং পরিবেশ নষ্ট করতে এমন ভাঙচুর চালিয়েছে। প্রশাসন দোষীদের চিহ্নিত করে ব্যবস্থা নিক।” উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক মো. লুৎফর রহমান বলেন, “সরকারকে প্রশ্নবিদ্ধ করার জন্য এক ধরনের কুচক্রী মহল রাতের অন্ধকারে এমন অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটিয়েছে। শারদীয় দুর্গোৎসব নির্বিঘ্ন করতে বিএনপির নেতাকর্মী ও প্রশাসন সর্বদা সতর্ক আছে।” কুমারখালী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) জামাল উদ্দিন বলেন, “মন্দির কমিটি এবং মন্দিরের জমি নিয়ে পূর্ব বিরোধ আছে বলে জেনেছি। খবর পেয়ে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করা হয়েছে। সিসিটিভি না থাকায় দুর্বৃত্তরা সুযোগ নিয়ে থাকতে পারে। বিষয়টি খতিয়ে দেখে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।” কুষ্টিয়া জেলা পুলিশের মুখপাত্র অতিরিক্ত পুলিশ সুপার ফয়সাল মাহমুদ বলেন, “ঘটনাটি জানতে পেরে সেখানে পুলিশ পাঠানো হয়েছে। তদন্ত সাপেক্ষে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”

আজকের সংবাদ, ফিচার, সম্পাদক

সংবাদ ও ইতিহাসের কলম কার হাতে?

নাসির উদ্দিন পাঠান :  সংবাদ ও ইতিহাস—দুটিই সত্যকে ধরে রাখার কথা। কিন্তু যখন কলমের নিয়ন্ত্রণ চলে যায় ক্ষমতাশীনদের হাতে, তখন সত্যের সঙ্গে ক্ষমতার স্বার্থের সংঘাত অনিবার্য হয়ে ওঠে। ইতিহাস বিজয়ীদের হাতে লেখা হয়—এ কথাটি বহু পুরোনো। কথাটির মধ্যে শুধু রাজনৈতিক ব্যঙ্গ নেই; এর ভেতরে রয়েছে ইতিহাস রচনার একটি কঠিন বাস্তবতা। যে পক্ষ রাষ্ট্রের ক্ষমতায় থাকে, তার হাতে থাকে সরকারি নথি, প্রশাসনিক বিবরণ, প্রচারযন্ত্র এবং জনমত প্রভাবিত করার সুযোগ। ফলে একটি ঘটনার কোন অংশটি সামনে আসবে, কোন অংশটি আড়ালে থাকবে এবং কোন ব্যাখ্যাটি ‘সরকারি সত্য’ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হবে—তার ওপর ক্ষমতার প্রভাব থাকতেই পারে। সংবাদের ক্ষেত্রেও একই বাস্তবতা দেখা যায়। একটি ঘটনা ঘটল। একজন সাংবাদিক সেটি সংবাদ হিসেবে প্রকাশ করলেন। কিন্তু সেই সংবাদে কোন বক্তব্য থাকবে, কার বক্তব্যকে শিরোনাম করা হবে, কোন তথ্যটি গুরুত্ব পাবে এবং কোন তথ্যটি বাদ যাবে—এসব সিদ্ধান্তের মধ্য দিয়েই তৈরি হয় একটি ‘বয়ান’। আর সেই বয়ান যদি বারবার একই দিক থেকে মানুষের সামনে উপস্থাপন করা হয়, একসময় সেটিই জনমানসে সত্যের একমাত্র সংস্করণ হয়ে উঠতে পারে।  ক্ষমতাশীনদের সবচেয়ে বড় শক্তি এখানেই—তারা শুধু রাষ্ট্র পরিচালনা করে না, অনেক সময় রাষ্ট্রের ঘটনাগুলোর ব্যাখ্যাও নির্ধারণ করার চেষ্টা করে। একটি গণআন্দোলনকে কেউ বলতে পারে ‘জনগণের অধিকার আদায়ের সংগ্রাম’, আবার ক্ষমতাসীন পক্ষ সেটিকে বলতে পারে ‘আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি’। একই ঘটনা, কিন্তু দুই ব্যাখ্যা। কোন ব্যাখ্যাটি ইতিহাসে টিকে থাকবে, তা অনেক সময় নির্ভর করে কে নথি তৈরি করছে, কে সংবাদ প্রচার করছে এবং কে ক্ষমতায় আছে তার ওপর। বাংলাদেশের ইতিহাসেও বিভিন্ন রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর অতীতের ঘটনা ও রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বকে মূল্যায়নের ক্ষেত্রে দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন আমরা দেখেছি। পৃথিবীর অন্য দেশেও একই প্রবণতা রয়েছে। ক্ষমতার পালাবদলের সঙ্গে সঙ্গে পাঠ্যপুস্তক, সরকারি বক্তব্য, স্মৃতিচর্চা এবং রাজনৈতিক ইতিহাসের ভাষ্যও অনেক সময় পরিবর্তিত হয়েছে। কিন্তু এখানেই সাংবাদিকতা ও ইতিহাসচর্চার সবচেয়ে বড় পরীক্ষা।  সাংবাদিকের দায়িত্ব কোনো সরকারের মুখপাত্র হওয়া নয়। সাংবাদিকের কাজ হলো প্রশ্ন করা। সরকারি বক্তব্য প্রকাশ করা প্রয়োজন, কিন্তু তার পাশাপাশি সেই বক্তব্যের সত্যতা যাচাই করাও প্রয়োজন। রাষ্ট্র যা বলছে, তার বিপরীত বক্তব্য কী? সরকারি নথির বাইরে সাধারণ মানুষের অভিজ্ঞতা কী? কোনো সিদ্ধান্তের ফলে কারা লাভবান হয়েছে, আর কারা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে? যে মানুষটি কথা বলার সুযোগ পাচ্ছে না, তার বক্তব্য কী? এসব প্রশ্ন না করলে সংবাদ হয়তো প্রকাশিত হবে, কিন্তু সত্যের অনুসন্ধান অসম্পূর্ণ থেকে যাবে। আর ইতিহাসবিদের দায়িত্ব আরও দীর্ঘমেয়াদি। কারণ সংবাদ আজকের জন্য, কিন্তু ইতিহাস আগামী প্রজন্মের জন্য। আজকের একটি ভুল বা একপেশে বয়ান আগামী দিনের মানুষের কাছে একটি পুরো সময়কাল সম্পর্কে ভুল ধারণা তৈরি করতে পারে।তবে আশার জায়গাটিও এখানেই। ক্ষমতা ইতিহাসের একটি সংস্করণ লিখতে পারে, কিন্তু সব সংস্করণ মুছে ফেলতে পারে না।  একজন প্রত্যক্ষদর্শীর স্মৃতি, পুরোনো সংবাদপত্র, ব্যক্তিগত চিঠি, ছবি, ভিডিও, আদালতের নথি, সরকারি দলিল, গবেষণাপত্র—সবকিছু মিলিয়ে ভবিষ্যতের গবেষকরা একদিন একটি ঘটনার নতুন পাঠ তৈরি করতে পারেন। সময়ের সঙ্গে অনেক চাপা পড়া সত্যও সামনে আসে। তাই ইতিহাসকে শুধু ‘কে জিতেছিল’ দিয়ে বিচার করা বিপজ্জনক। জানতে হবে—কে কী হারিয়েছিল, কারা কথা বলতে পারেনি, কারা ইতিহাসের পাতায় জায়গা পায়নি এবং কেন পায়নি। একইভাবে সংবাদ পড়ার সময়ও পাঠকের দায়িত্ব আছে। সংবাদপত্রে ছাপা হয়েছে বলেই সবকিছু সত্য ধরে নেওয়া যেমন ঠিক নয়, তেমনি নিজের রাজনৈতিক বিশ্বাসের সঙ্গে মিলে গেলেই কোনো সংবাদকে সত্য বলে মেনে নেওয়াও বিপজ্জনক। একজন সচেতন পাঠককে তাই শুধু সংবাদ পড়লে হবে না; তাকে সংবাদ পড়তে জানতে হবে। কারণ শিরোনামের বাইরেও সত্য থাকে। সরকারি বক্তব্যের বাইরেও সত্য থাকে। বিরোধী দলের বক্তব্যের বাইরেও সত্য থাকে। এমনকি সাংবাদিকের প্রতিবেদনের বাইরেও কখনো কখনো আরও বড় বাস্তবতা লুকিয়ে থাকে। গণতন্ত্রে ক্ষমতার পরিবর্তন স্বাভাবিক। আজ যারা ক্ষমতায়, কাল তারা বিরোধী দলে যেতে পারে। আজ যারা বিরোধী, কাল তারা রাষ্ট্র পরিচালনা করতে পারে। কিন্তু সংবাদমাধ্যম ও ইতিহাসের দায়িত্ব কোনো পক্ষের সঙ্গে ক্ষমতার পালাবদল করা নয়। তাদের দায়িত্ব সত্যের সঙ্গে থাকা। ক্ষমতাশীনরা নিজেদের মতো করে সংবাদ লিখতে চাইবে, নিজেদের মতো করে ইতিহাসও ব্যাখ্যা করবে—এটি নতুন কোনো ঘটনা নয়। কিন্তু একটি স্বাধীন সমাজের শক্তি হলো, সেখানে একাধিক বয়ান থাকবে, প্রশ্ন করার সুযোগ থাকবে এবং শেষ পর্যন্ত তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে সত্য যাচাই করার সুযোগ থাকবে। কারণ ইতিহাস শুধু ক্ষমতাশীনদের লেখা কাহিনি নয়। ইতিহাস হলো সময়ের সাক্ষ্য। আর সেই সাক্ষ্যের সবচেয়ে বড় বিচারক—সময় নিজেই। আজকের ক্ষমতার কলম হয়তো একটি গল্প লিখবে। কিন্তু আগামী দিনের গবেষক, সাংবাদিক ও মানুষ সেই গল্পের পাশে আরেকটি প্রশ্ন লিখে দিতে পারে—“এটাই কি পুরো সত্য?” লেখক: গণমাধ্যমকর্মী, ঢাকা।

Scroll to Top