২৯শে অক্টোবর, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ

শিমুল জাবালি’র কবিতা

১. শিশিরমহাজন

রাত হইতেছে গভীর, ঘাসে বইসা কী করো শিশিরমহাজন?
জোছনাগদি থাইকা আলো নিয়া ধার-বিনা সুদে, বিনা দলিলে;
সে জানে না তার ঋণের বহর, সারারাত ঝিকমিক করে, ঘুমায় রাজার হালে
ভোরবেলা সুরুজ আসে পাওনাদার হইয়া, ফোঁটায় ফোঁটায় উসুল কইরা নেয় বাষ্পে—
সে টেরও পায় না কখন নিঃস্ব হলো, দুপুরে তার মাথা নত, ম্লান, গরিব।

তবু সন্ধ্যা নামলে আবার আসে মহাজন, আবার ধার, আবার ঝিকিমিকি;
নিঃস্ব হওয়া আর ধনী হওয়ার এই দোলনায়-দুলতে দুলতে ঘাসের জীবন যায়,
অভিযোগ নাই, মামলা নাই, সবুজের কোনো উকিল লাগে না।

এই লেনদেনের নাম কেউ রাখে শোষণ, কেউ রাখে করুণা
আমি রাখি সংসার

আমার মা-ও এমন ছিলেন—
সারাদিন বিলাইতেন, রাইতে নিঃস্ব
তবু পরদিন দেখি আঁচলভরা আলো; কোন গদি থিকা আনতেন আজও জানি না,
মায়েদের মহাজন সম্ভবত আসমানে থাকেন, খাতা রাখেন না, সুদ নেন দোয়ায়।

আমিও ধার করি আজকাল, শিশিরমহাজন
নিশ্বাসব্রতে জমা রাখি ঘুম– শোধ হবে না জানি,
তবে মহাজনি আইনে প্রেমিকদের জেল হয় না,
হয় নির্জনতা ও যাবজ্জীবন।

২. পাতাঝরার ডাকঘর

হেমন্ত এলে গাছেরা ডাকঘর খুইলা বসে, প্রতিটি ঝরাপাতা এক একখানা চিঠি
প্রাপক: মাটি, প্রেরক: আসমান, বাহক: হাওয়া, বেতনবিহীন।
চিঠিগুলা পড়তে জানে কেবল পিঁপড়ারা, সারি বাইন্ধা আসে, অক্ষরে অক্ষরে হাঁটে—
জরুরি খবরগুলা বইয়া নিয়া যায় মাটির তলায়–
শিকড়েরা খবর পাইয়া নড়েচড়ে বসে, বসন্তের প্রস্তুতি লয় আন্ধারে বইসাই

উপরে যারে আমরা মরা মৌসুম বলি, নিচে তার নাম চিঠি বিলির কাল
কুড়ানি মেয়েটা পাতা কুড়ায় জ্বালানির লাইগা,
সে জানে না কত চিঠি পুড়াইয়া ভাত রান্ধে; জানলে হয়তো পড়ত দুই একখান

না জানাই ভালো–
চিঠি পোড়ানো আগুনে ভাত নাকি মিঠা হয় বেশি, লেখা আছে হাওয়ার ডাকবিধিতে–
আমিও চিঠি লেখতাছি বহুদিন ধইরা- পাঠাই না, জমাই
ঝরার সময় হইলে গাছের কাছে শিখতে যাব, ক্যামনে এত সহজে ছাইড়া দেওয়া যায়
নিজের লেখা, নিজের রং, নিজের গ্রীষ্মকাল!

গাছ শিখাইব, গাছের কাছে টিউশন ফি লাগে না—
লাগে খালি ধৈর্য, আর একখান হেমন্ত

ডাকঘর বন্ধ হয় মাঘের শীতে-গাছেরা তখন ন্যাড়া, নিঃস্ব ও নীরব;
মনে হয় দেউলিয়া, আসলে অবসর

সব বিলি শেষ, এইবার বিশ্রাম

যে ডাকপিয়নের চিঠি ফুরায়, তার ঘুমের নাম শীতকাল

৩. নদীর নাইওর

আশ্বিন মাসে নদী নাইওর যায় সমুদ্রের বাড়ি
যাওয়ার আগে ঘাটে ঘাটে কুশল রাইখা যায়
কলসির কানায় কানায় ঢাইলা যায় শেষ বিকালের রং

নদীর মা নাই, তবু বাপের বাড়ি বইলা কথা থাকে সবারই;
পাহাড়ের কথা মনে হইলে নদীরও বুক ভার হয়,
উজানের দিকে চাইয়া থাকে অপলক

স্রোতের বিপরীতে ফেরা যায় না বইলাই
সে এত গান জানে

অক্ষমতা থিকাই জন্মায় সুর, জানে মাঝিরা
জাইনাই তারা ভাটিয়ালিতে এত দরদ ঢালে

যাওয়ার পথে নদী যা দেখে সব মনে রাখে:
কোন ঘাটে কোন বধূ চুল ভিজাইলো
কোন ছেলে প্রথম সাঁতার শিখলো কাইন্দা কাইটা
কোন বুড়া বিকালবেলা একলা বইসা রইলো
কারে যেন খুঁজলো জলের ভিতর!

নদী সব লেইখা রাখে ঢেউয়ের খাতায়, সমুদ্রে গিয়া জমা দেয়–
সমুদ্র এত বড় এই কারণেই
পৃথিবীর সব নদীর মুখস্থ কথা– তার বুকে রাখা আছে, নোনামৃত।

মানুষ ভাবে সমুদ্রের জল খাওয়া যায় না লবণে–
আসলে ওই জলে এত কাহিনি গোলা
এত বিদায়, এত ঘাট, এত অপেক্ষা
যে গিলতে গেলে গলা ধইরা আসে

লবণ তো উছিলা
মানুষ কান্দনের স্বাদ চিনা ফালাইবো বইলাই
সমুদ্র নিজেরে অখাদ্য কইরা রাখছে

নাইওর শেষে নদী ফিরে না ঠিকই
তবে বর্ষায় তার বইনেরা আসে মেঘ হইয়া
বাপের বাড়ির খবর লইয়া;
বৃষ্টির শব্দে কান পাতলে শোনা যায়
পাহাড় ভালা আছে, ঝরনারা ভালা আছে
খালি তোমাগো লাইগা মন পোড়ে

এই খবরটুকুর লাইগাই
শুকনা খালেরাও প্রতি আষাঢ়ে দুই কূল ভাসাইয়া কান্দে

৪. ঘুমের মুসাফির

ঘুম এক দূরের মুল্লুক, ভিসা লাগে না
তবু সবাই পৌঁছাইতে পারে না রোজ

আমি রাতভর সীমান্তে বইসা থাকি,
চোখের চেকপোস্টে আটকা পড়ে স্বপ্নের কাফেলা

যারা সহজে ঘুমায় তারা জানে না, তারা কত বড় জমিদারির মালিক
বালিশে মাথা রাখলেই খুইলা যায় সদর দরজা
পক্ষিরাজ ছাড়াই পাড়ি দেয় সাত সমুদ্র

আর আমরা যারা জাইগা থাকি
আমরা সেই মুল্লুকের ভিখারি
দুয়ারে দুয়ারে ঘুরি, ভাঙা থালা হাতে
দুই মুঠ তন্দ্রা পাইলে বর্তে যাই

শেষরাতে করুণা হয় কারো
আধা ঘুম জোটে, ছেঁড়া কাঁথার মতন
গায়ে দিলে পাও বাইর হইয়া থাকে
পাও ঢাকলে বুক

সেই আধা ঘুমের ভিতর যে স্বপ্ন আসে–
সেও আধা, রংচটা, শব্দহীন সিনেমা

তবু দেখি, গরিবের আবার বাছাবাছি কী!

ডাক্তার বড়ি দেয়, বলে খাইলেই ঘুম
বড়ির ঘুম আর মায়ের কোলের ঘুম
এক জিনিস না, ডাক্তাররে কই নাই
সে বুঝবো না, তার মা তো বাঁইচা আছে

তবু ভোরের দিকে, আজানের একটু আগে
পাখি ডাকার একটু আগে যে নীরবতা
সেই নীরবতাটুকু মুসাফিরের সরাইখানা

ওইখানে সব জাগনা মানুষ এক কাতারে বসে–
কেউ কারে চিনে না, তবু সবাই স্বজন;
নিদ্রাহীনতার এই এক সুখ
সে অন্তত একলা ঘুমাইতে দেয় না কাউরে

৫. আলোর ওয়ারিশ

আমার কিছু নাই, তবু উইল কইরা যাইতে চাই
সন্তানের নামে লেইখা যাই ভোরবেলাটা,
শিশিরের দানাগুলা, দোয়েলের প্রথম শিস
আর কার্তিকের ভোরে ধানখেতের উপর দিয়া
ভাইসা আসা সেই গন্ধ—যার কোনো নাম হয় নাই আজও
হইলে সবাই কিনতে চাইতো

জমিজমা নাই, দালান নাই, ব্যাংকব্যালেন্স নাই
কেউ জিগাইলে কমু, আসমানে জমা রাখছি সব
মেঘে মেঘে আমার ব্যাংক, বৃষ্টিতে আসে কিস্তি
রংধনু আমার চেকবই, সাত পাতার

লোকে হাসবো, হাসুক
যে জীবনে হাসাইতে পারছি
সে জীবন লোকসানের না

সন্তানরে শিখাইয়া যাবো খালি দুইটা জিনিস:
ক্যামনে তাকাইতে হয়, আর ক্যামনে থামতে হয়

তাকাইলে দেখবা ঘাসের ডগায় সূর্য দুলতেছে
থামলে শুনবা পাতার ভিতর হাওয়ার সংসার
এই দুই বিদ্যা জানলে কেউ গরিব না
না জানলে রাজাও ফকির
সিন্দুকভরা সোনার ভিতর বইসা সে খুঁজবো-
কী জানি নাই, কী জানি নাই!

আলো কারো একলার সম্পত্তি না, এইটুকুই আমার দলিল
সাক্ষী রইলো ঘাস, নদী, ভোরের আজান, সন্ধ্যার শাঁখ
ওয়ারিশ হইতে কোনো আদালতে যাইতে হয় না
চোখ খুইলা তাকাইলেই তামিল হয় উইল

যেদিন আমি থাকব না
সেদিনও ভোর হবে, শিশির নামবে
দোয়েল শিস দিবো কারফিউ না

Tags:

সর্বশেষ

Calendar
Mon Tue Wed Thu Fri Sat Sun
 1234
567891011
12131415161718
19202122232425
262728293031  
Scroll to Top