নাছির উদ্দিন খান–এর গুচ্ছ কবিতা
মানুষ ও যন্তু
একখণ্ড বিশাল আকাশ
আমার দু’চোখ ভরা বিস্তৃর্ণ গ্রাম,
এখানেই আমার বসন্ত শুরু
এখানেই আমার অনিঃশেষ ভোর,
অমাবস্যা কিংবা পূর্ণিমা।
নিঃশ্চুপ মৃতদেহের মতো হেঁটে চলা
এই ভূমে আমার পদযুগলে–
ব্যথার শেষ নেই।
এখানে দু’পায়া যেসব জন্তু হেঁটে বেড়ায়
অন্য জন্তুরা এদের মানুষ বলে,
অথচ আমার ভোর হলেই দেখি
দু’পায়া জন্তুগুলো আমার চারপাশে।
আমি প্রায়ই ভাবি,
এত জন্তুর মাঝে আমি কীভাবে গাছ কিংবা বণ্যপ্রাণী হলাম না?
সেদিন ভোরে কবরস্থান ঘেঁষে হেঁটে যেতে দেখি,
মৃতরা নিঃশ্চুপ শুয়ে শুয়ে তাই ভাবে।
ওপারেও অন্ধকার
আমার ঊনচল্লিশটি বসন্ত পার হলো
এরপর গত হলো কয়েক ডজন গোধূলি
এরপর মাঠের ওপাশ থেকে রাত হলে
নীল জোছনা নামে
অথচ আমার জীবনে সেই অমাবস্যাই রয়ে গেল।
জানালাহীন ঘরের ফাঁক দিয়ে আমি
অন্ধকারে বসে অন্ধকার দেখি–
তবু আমার নিজেকে দেখার সুযোগ হয় না।
যখন ভোর হয়
আমার তখন আরো একটি দেয়াল ডিঙ্গিয়ে
নতুন কোনো অন্ধকারের মুখে
পাঠশালার মতোই পড়তে হয়
অন্য কোনো অন্ধকার
আমার দেয়ালের ওপারেও আরো অনেক দেয়াল
আরো অনেক অন্ধকার।
যদি আর না ফিরি
যদি আর না ফিরি,
যদি কাকডাকা ভোরে
মসজিদের মাইকে হয় এলান,
আমার নামের শেষ সংবাদ,
যদি এটাই হয় শেষ যাত্রা
আমি এবং অমীয় সত্য
আমার মৃত্যু যদি ঘিরে ধরে আমায়
স্বাধীনতার নাম করে যদি কেড়ে নেয়
আমাকে, যদি বিচ্ছিন্ন করে দেহ-মন।
তোমার দরজার ওপারে
কলিং বেল চাপার মতো কেউ ছিল?
হুম, আমিই ছিলাম,
যার কোনো মূল্য নেই,
মূল্যহীন হতে হতে
আমার যাত্রার আরম্ভ–
শেষ যাত্রা,
না ফেরার কোনো এক গন্তব্য।
তবে—বেসুরাও গলার আবৃত্তি,
অগোছানো পড়ার টেবিল
সব কিছুই তোমার কাছে উচ্ছিষ্ট মনে হবে,
যেমনি করে আমাকেও মনে হতো।
নিজস্বতা
একদিন আমাদের ভোর ছিল,
আমাদের নিজস্ব ভোর;
পাতা কুড়ানো কিংবা
মক্তবে আযান দেওয়া ভোর।
অথচ; বহুকাল পরে এসে জানলাম
পৃথিবীতে আমাদের নিজস্ব বলতে কিছু নেই।
সেই পাতা কুড়ানো ভোর কিংবা
মক্তবে আযান দেওয়া ভোর
সবই ছিল সৃষ্টিকর্তার সুনিপুণ পরিকল্পনা–
মৃত্যুর দিকে এগিয়ে নেওয়া
এবং
মৃত্যু ছাড়া আমাদের আর নিজস্ব কোনো কিছু নেই।
ভালো থেকো
ভালো থেকো ফুল,
ভালো থেকো পাখি,
ভালো থেকো ব্যথা
জলে ভরা আঁখি।
ভালো থেকো নদী
ভালো থেকো জল,
ভালো থেকো পথিক
লক্ষ্যে অবিচল।
ভালো থেকো প্রিয়
ভালো থেকো তারা,
ভালো থেকো—মোরে
ভালাবাসো যারা।
