স্টাফ রিপোর্টার :
চাঁদপুরের ফরিদগঞ্জে সাত বছর বয়সী এক শিশুকে ধর্ষণচেষ্টার মামলায় গ্রেপ্তারের পর পুলিশি হেফাজতে মিজানুর রহমান (৫৫) নামে এক আসামির মৃত্যু হয়েছে।
বৃহস্পতিবার (৩০ জুলাই) সকালে তাকে ফরিদগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়া হলে কর্তব্যরত চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন। ঘটনাকে কেন্দ্র করে এলাকায় চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে।
নিহতের পরিবার অভিযোগ করেছে, পুলিশি নির্যাতনের কারণেই তার মৃত্যু হয়েছে। তবে এ বিষয়ে পুলিশের আনুষ্ঠানিক বক্তব্য তাৎক্ষণিকভাবে পাওয়া যায়নি।
নিহত মিজানুর রহমান ফরিদগঞ্জ উপজেলার কড়ৈতলী গ্রামের বাবুর বাড়ির বাসিন্দা। তিনি স্থানীয় একটি হাফিজিয়া মাদ্রাসার শিক্ষক ও একটি মসজিদের ইমাম ছিলেন। দীর্ঘদিন প্রবাসেও কর্মরত ছিলেন।
পুলিশ সূত্রে জানা যায়, কয়েকদিন আগে কড়ৈতলী গ্রামের সাত বছর বয়সী এক শিশুকে ধর্ষণচেষ্টার অভিযোগে মিজানুর রহমানের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের হয়। ওই মামলায় বৃহস্পতিবার ভোরে নিজ বাড়ি থেকে তাকে গ্রেফতার করা হয়। পরে থানায় নেওয়ার পথে গাজীপুর বাজার এলাকায় তিনি অসুস্থ হয়ে পড়লে পুলিশ দ্রুত তাকে ফরিদগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যায়। সেখানে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
অন্যদিকে, নিহতের স্বজনরা এ ঘটনাকে স্বাভাবিক মৃত্যু মানতে নারাজ। নিহতের ভাই মো. জুয়েল দাবি করেন, মিথ্যা অপবাদ এবং শারীরিক নির্যাতনের কারণেই তার ভাইয়ের মৃত্যু হয়েছে।
তিনি বলেন, “হাসপাতালে গিয়ে দেখি আমার ভাইয়ের অণ্ডকোষের স্থান দিয়ে রক্ত বের হচ্ছিল এবং একটি অণ্ডকোষ অস্বাভাবিকভাবে ফুলে ছিল। আমাদের বিশ্বাস, তাকে রাতে নির্মমভাবে নির্যাতন করা হয়েছে। ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত করে দায়ীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চাই।”
তিনি আরও অভিযোগ করেন, “আমার ভাই ফজরের নামাজ আদায় করতে চেয়েছিলেন, কিন্তু তাকে সেই সুযোগও দেওয়া হয়নি। যদি তিনি অপরাধী হয়ে থাকেন, তাহলে আইনের মাধ্যমে বিচার হতো। কিন্তু তাকে হত্যার কোনো অধিকার কারও নেই।”
নিহতের স্বজন মামুন পাটোয়ারী অভিযোগ করেন, কড়ৈতলী গ্রামের মুশফিকুর রহমান ইমু, আসিফ ভুঁইয়া ও কালু মিয়ার নেতৃত্বে একটি চক্র কয়েকদিন ধরে মিজানুর রহমানের কাছে পাঁচ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করছিল। তাদের যোগসাজশেই তাকে মানসিকভাবে হয়রানি করা হয়েছে। তবে এ অভিযোগের বিষয়ে অভিযুক্তদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
ফরিদগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের জরুরি বিভাগের কর্তব্যরত চিকিৎসক ডা. মাকসুদুল হাসান জানান, “পুলিশ ভোরে একজন ব্যক্তিকে হাসপাতালে নিয়ে আসে। হাসপাতালে পৌঁছানোর সময় তিনি সংকটাপন্ন অবস্থায় ছিলেন। প্রাথমিকভাবে তার কার্ডিয়াক অ্যারেস্ট হয়ে থাকতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। ইসিজিসহ প্রয়োজনীয় চিকিৎসা দেওয়া হলেও তাকে বাঁচানো সম্ভব হয়নি।”
উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. আসাদুজ্জামান জুয়েল বলেন, “হাসপাতালে আনার পরে চিকিৎসাসেবা দেয়া অবস্থায়ই তার মৃত্যু হয়েছিল বলে জেনেছি। সে সময় আমি হাসপাতালে উপস্থিত ছিলাম না।”
এদিকে, পরিবারের নির্যাতনের অভিযোগের বিষয়ে পুলিশের কোনো আনুষ্ঠানিক বক্তব্য তাৎক্ষণিকভাবে পাওয়া যায়নি।
পরে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট তানভীর রাব্বির উপস্থিতিতে মরদেহের সুরতহাল সম্পন্ন করে ময়নাতদন্তের জন্য চাঁদপুর জেনারেল হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয়। পুলিশ জানিয়েছে, ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন পাওয়ার পরই মৃত্যুর প্রকৃত কারণ সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া যাবে।
উল্লেখ্য, এ ঘটনায় মৃত্যুর কারণ নিয়ে ভিন্ন ভিন্ন দাবি সামনে এসেছে। একদিকে পরিবারের অভিযোগ, অন্যদিকে চিকিৎসকের প্রাথমিক ধারণা এবং পুলিশের বর্ণনা—সবকিছুর চূড়ান্ত সত্যতা নির্ভর করছে ময়নাতদন্তের প্রতিবেদনের ওপর। তাই তদন্ত শেষ হওয়ার আগে মৃত্যুর কারণ সম্পর্কে নিশ্চিত কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছানো সম্ভব নয়।
ফরিদগঞ্জ টাইমস/কেএম
