২৮শে অক্টোবর, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ

‎মো. আব্দুল কাদির :  

‎‎ধর্মীয় স্বাধীনতা, পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ ও সামাজিক সম্প্রীতি একটি শান্তিপূর্ণ সমাজের অন্যতম ভিত্তি। বাংলাদেশ বহুধর্মীয় মানুষের দেশ। এদেশে বিভিন্ন ধর্মের মানুষ দীর্ঘদিন ধরে পাশাপাশি বসবাস করে আসছেন। প্রতিবছর হিন্দু সম্প্রদায়ের দুর্গাপূজাসহ বিভিন্ন ধর্মীয় উৎসব পালিত হয়। এসব উৎসবকে কেন্দ্র করে ধর্মীয় বিশ্বাস, সামাজিক দায়িত্ব ও পারস্পরিক আচরণ নিয়ে আলোচনা সামনে আসে। একজন মুসলিম হিসেবে এক্ষেত্রে আমাদের করণীয় কী—তা ইসলামের মৌলিক শিক্ষা ও নীতিমালার আলোকে বিবেচনা করা প্রয়োজন।

‎ইসলাম মুসলিমের জন্য স্বতন্ত্র আকিদা ও ইবাদতের বিধান নির্ধারণ করেছে। তাওহিদ ইসলামের মূল ভিত্তি। তাই অন্য ধর্মের উপাসনা ও ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণের প্রশ্নে একজন মুসলিমকে নিজের আকিদা ও শরিয়তের বিধান সম্পর্কে সচেতন থাকতে হবে। তবে নিজের ধর্মীয় বিশ্বাসে অবিচল থাকার অর্থ অন্য ধর্মাবলম্বীদের প্রতি বিদ্বেষ, অবজ্ঞা কিংবা অন্যায় আচরণ করা নয়। বরং ইসলাম নিজস্ব ধর্মীয় পরিচয় বজায় রেখেই অন্যের প্রতি ন্যায়বিচার ও সদাচরণের শিক্ষা দেয়।

‎পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তাআলা বলেন, “দ্বীনের ব্যাপারে কোনো জবরদস্তি নেই।” (সূরা আল-বাকারা, আয়াত ২৫৬)। আবার সূরা আল-মুমতাহিনার ৮ নম্বর আয়াতে শান্তিপূর্ণ অমুসলিমদের প্রতি সদাচরণ ও ন্যায়বিচার করতে আল্লাহ নিষেধ করেননি বলে উল্লেখ করা হয়েছে। এ নির্দেশনা থেকে স্পষ্ট হয়, ধর্মীয় বিশ্বাসের পার্থক্য থাকা সত্ত্বেও শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান, ন্যায়সংগত আচরণ ও মানবিক দায়িত্ব পালনের গুরুত্ব ইসলামে স্বীকৃত।

‎দুর্গাপূজার সময় একজন মুসলিমের প্রথম দায়িত্ব হলো নিজের আকিদা ও ধর্মীয় স্বাতন্ত্র্য অক্ষুণ্ন রাখা। ধর্মীয় উপাসনায় অংশগ্রহণ এবং সাধারণ সামাজিক সৌজন্য এক বিষয় নয়। অন্য ধর্মের উপাসনামূলক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণের ক্ষেত্রে ইসলামী বিধান অনুসরণ করতে হবে। একই সঙ্গে প্রতিবেশীর সঙ্গে সদাচরণ, বিপদগ্রস্ত মানুষকে সহযোগিতা, মানুষের জানমাল ও অধিকার রক্ষা এবং সামাজিক শান্তি বজায় রাখা একজন মুসলিমের নৈতিক দায়িত্ব।

‎দুঃখজনকভাবে, কখনো কখনো ধর্মীয় উৎসবকে কেন্দ্র করে গুজব, উসকানিমূলক বক্তব্য ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিদ্বেষ ছড়ানোর ঘটনা উত্তেজনা সৃষ্টি করে। এ ধরনের পরিস্থিতিতে সত্য যাচাই না করে কোনো তথ্য প্রচার করা উচিত নয়। কোনো ধর্মের উপাসনালয়ে হামলা, ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ কিংবা ব্যক্তিগত সম্পত্তি নষ্ট করা অন্যায়। ধর্মীয় পরিচয়ের কারণে কারো নিরাপত্তা ও অধিকার ক্ষুণ্ন করাও গ্রহণযোগ্য নয়। একজন সচেতন মুসলিমের দায়িত্ব হলো অন্যায় থেকে বিরত থাকা, শান্তি বজায় রাখতে সহযোগিতা করা এবং প্রয়োজন হলে দায়িত্বশীল কর্তৃপক্ষকে অবহিত করা।

‎এ প্রসঙ্গে পবিত্র কুরআনের একটি গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশনা স্মরণ করা প্রয়োজন। সূরা আল-মায়িদার ৮ নম্বর আয়াতে আল্লাহ তাআলা বলেন, “কোনো সম্প্রদায়ের প্রতি বিদ্বেষ যেন তোমাদেরকে ন্যায়বিচার না করতে উদ্বুদ্ধ না করে। তোমরা ন্যায়বিচার করো; এটিই তাকওয়ার অধিক নিকটবর্তী।” এই নির্দেশনা আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়, মতপার্থক্য কিংবা ব্যক্তিগত অপছন্দ যেন কাউকে অন্যায় আচরণে প্ররোচিত না করে।

‎পূজা উপলক্ষে শুভেচ্ছা বিনিময়, সামাজিক সৌজন্য প্রকাশ এবং ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণের বিষয়গুলোও আলাদাভাবে বিবেচনা করা জরুরি। ধর্মীয় উপাসনায় অংশগ্রহণের প্রশ্নে ইসলামী বিধান অনুসরণ করতে হবে। অন্যদিকে প্রতিবেশীর খোঁজখবর নেওয়া, অসুস্থ ব্যক্তিকে দেখতে যাওয়া কিংবা বিপদে সহযোগিতা করা সামাজিক ও মানবিক আচরণের অংশ। নির্দিষ্ট ধর্মীয় শুভেচ্ছাবাক্য ব্যবহারের বিধান নিয়ে আলেমদের মধ্যে মতপার্থক্য থাকায় এ বিষয়ে নির্ভরযোগ্য আলেমের পরামর্শ নেওয়া যেতে পারে।

‎ধর্মীয় সম্প্রীতির অর্থ সব ধর্মের বিশ্বাসকে এক মনে করা নয়। বরং নিজ নিজ ধর্মীয় বিশ্বাস বজায় রেখে পরস্পরের অধিকার, মর্যাদা ও নিরাপত্তা রক্ষা করাই এর মূল কথা। একজন মুসলিম আকিদায় দৃঢ় থাকবেন, ইবাদতে নিষ্ঠাবান হবেন এবং মানুষের সঙ্গে আচরণে ন্যায়পরায়ণ ও দায়িত্বশীল থাকবেন—এটাই ইসলামের শিক্ষার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।

‎এজন্য ব্যক্তি, পরিবার, আলেম-ওলামা, সামাজিক সংগঠন ও প্রশাসনের সম্মিলিত ভূমিকা প্রয়োজন। ধর্মীয় বিষয়ে দায়িত্বশীল আলোচনা, গুজব প্রতিরোধ, আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় সহযোগিতা এবং সব মানুষের অধিকার রক্ষার মাধ্যমে সমাজে আস্থা ও শান্তির পরিবেশ গড়ে তোলা সম্ভব।

‎পরিশেষে বলা যায়, আকিদায় দৃঢ়তা, আচরণে শালীনতা এবং ন্যায়বিচারে অবিচলতা—একজন আদর্শ মুসলিমের চরিত্রের গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য। নিজের ধর্মীয় বিশ্বাস অক্ষুণ্ন রেখেও অন্যের প্রতি সদাচরণ করা, অন্যায় থেকে বিরত থাকা এবং শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান নিশ্চিত করতে ভূমিকা রাখা সম্ভব। পূজা উদযাপনকে কেন্দ্র করে আমাদের সমাজে এমন পরিবেশ প্রতিষ্ঠিত হোক, যেখানে প্রত্যেকে আইন অনুযায়ী ধর্ম পালনের সুযোগ পাবেন এবং কারও ধর্মীয় পরিচয় তার নিরাপত্তা ও অধিকার হরণের কারণ হবে না। ধর্মীয় পার্থক্য নয়, বরং ন্যায়বিচার, দায়িত্বশীলতা ও পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ হোক শান্তিপূর্ণ সমাজ গঠনের ভিত্তি। 

Tags:

সর্বশেষ

Calendar
Mon Tue Wed Thu Fri Sat Sun
 1234
567891011
12131415161718
19202122232425
262728293031  
Scroll to Top