২৯শে অক্টোবর, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ

এস. এম তাইয়্যেব : 

১৯১৭ সালে প্রতিষ্ঠিত চাঁদপুর গনি মডেল উচ্চ বিদ্যালয় শিক্ষা বিস্তারের পাশাপাশি চাঁদপুরের ক্রীড়াঙ্গনেও দীর্ঘদিন ধরে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে। প্রতিষ্ঠার পর থেকে এ বিদ্যালয় থেকে অসংখ্য শিক্ষার্থী ক্রীড়াঙ্গনে অংশ নিয়ে জেলা, বিভাগ ও জাতীয় পর্যায়ে সুনাম ও গৌরব অর্জন করেছে। চাঁদপুরের ক্রীড়াঙ্গনে সবচেয়ে বেশি অবদান রাখা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে গনি মডেল উচ্চ বিদ্যালয়ের নাম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। 

১৯১৭ সালে প্রতিষ্ঠার পর থেকে গনি মডেল উচ্চ বিদ্যালয়ের মাঠ শুধু বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের পাঠদান আর খেলাধুলার মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না। চাঁদপুরের ক্রীড়া ও সামাজিক-সাংস্কৃতিক ইতিহাসেও এ মাঠ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। বিদ্যালয়ের বার্ষিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতার পাশাপাশি আশপাশের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও স্থানীয় সংগঠনের ক্রীড়া উৎসবের অন্যতম পরিচিত ভেন্যু ছিল এ মাঠ। একসময় গনি মডেল স্কুলের মাঠকে খেলোয়াড় তৈরির ‘চারণভূমি’ বলা হতো।

চাঁদপুরের অনেক প্রবীণ ও স্বনামধন্য খেলোয়াড়—যাঁরা পরবর্তীতে জেলা ও জাতীয় পর্যায়ে খেলেছেন, তাঁদের শৈশব ও কৈশোরে খেলাধুলার হাতেখড়ি হয়েছিল এই মাঠে। বিদ্যালয়ের মাঠ থেকেই অনেক উদীয়মান খেলোয়াড় প্রাথমিক প্রশিক্ষণ নিয়ে পরবর্তীতে বড় পর্যায়ে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করেছেন।

বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক নাজির আহমেদ বলেন, প্রতিবছর নিয়মিতভাবে বার্ষিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতা, ইনডোর গেমস ও বিভিন্ন ইভেন্টের আয়োজন করা হয়। এসব আয়োজনের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের মধ্যে ছোটবেলা থেকেই খেলাধুলার প্রতি আগ্রহ তৈরি হয়। বিদ্যালয়ের বেশ কয়েকজন সাবেক খেলোয়াড় ঢাকার পাইওনিয়ার লিগ, তৃতীয় বিভাগ ও দ্বিতীয় বিভাগ ফুটবল লিগে বিভিন্ন ক্লাবের হয়ে খেলেছেন। এসব লিগ দেশের পেশাদার ফুটবলের মূল ভিত্তি হিসেবে কাজ করে।

বিদ্যালয়ের নিজস্ব বড় খেলার মাঠ না থাকলেও জেলা স্টেডিয়ামের অত্যন্ত কাছে অবস্থিত হওয়ায় শিক্ষার্থীরা স্টেডিয়ামে গিয়ে উন্নত অ্যাথলেটিকস চর্চার সুযোগ পায়। ১০০ ও ২০০ মিটার স্প্রিন্ট, লং জাম্প ও হাই জাম্পের মতো ইভেন্টে বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা জাতীয় স্কুল অ্যাথলেটিকসে পদকও অর্জন করেছে।

চাঁদপুর গনি মডেল উচ্চ বিদ্যালয়ের ফুটবল দলও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে একাধিক সাফল্য অর্জন করেছে। ২০২৩-২৪ মৌসুমে ২০২৪ সালের মে মাসে কুমিল্লা শহীদ ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত বিভাগীয় ফাইনাল ম্যাচে শক্তিশালী কুমিল্লা হাই স্কুলকে পরাজিত করে চট্টগ্রাম বিভাগীয় চ্যাম্পিয়ন হওয়ার গৌরব অর্জন করে বিদ্যালয়টি। 

এর আগে ২০২২-২৩ মৌসুমে জাতীয় পর্যায়ে রানার্সআপ হয় গনি মডেল উচ্চ বিদ্যালয়। ২০২৩ সালে দেশের সেরা স্কুলগুলোর সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে তারা জাতীয় পর্যায়ের ফাইনালে ওঠে। ফতুল্লার খান সাহেব ওসমান আলী স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত ফাইনালে দিনাজপুর একাডেমির কাছে অল্প ব্যবধানে পরাজিত হয়ে জাতীয় পর্যায়ে রানার্সআপ হওয়ার গৌরব অর্জন করে।

ফুটবলের পাশাপাশি ক্রিকেটেও বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা সাফল্য দেখিয়ে আসছে। প্রাইম ব্যাংক স্কুল ক্রিকেটে বিদ্যালয়ের তরুণ ক্রিকেটাররা নিয়মিত ভালো পারফরম্যান্স করছেন। ২০২৬ সালের আসরেও বিদ্যালয়ের বাঁহাতি স্পিনার মিশারী একটি ম্যাচে মাত্র ২১ রান খরচ করে একাই ৬ উইকেট শিকার করে আলোচনায় আসেন। প্রতি বছর চাঁদপুর জেলা পর্যায়ে চ্যাম্পিয়ন অথবা রানার্সআপ হয়ে বিদ্যালয়টি জাতীয় ও বিভাগীয় পর্যায়ে খেলার সুযোগ পায়। এসব পর্যায়ে সিলেট, পিরোজপুরসহ দেশের বিভিন্ন শক্তিশালী দলের বিপক্ষেও তারা খেলেছে এবং সাফল্য অর্জন করেছে।

এছাড়াও প্রতি বছর অনুষ্ঠিত জাতীয় স্কুল ও মাদ্রাসা ফুটবল টুর্নামেন্টেও চাঁদপুর গনি মডেল উচ্চ বিদ্যালয়ের ফুটবল দল নিয়মিত চাঁদপুর সদর উপজেলা ও জেলা পর্যায়ের অন্যতম সেরা দল হিসেবে উঠে আসে। বিদ্যালয়ের অনেক ফুটবলার বর্তমানে স্থানীয় প্রথম ও দ্বিতীয় বিভাগ লিগেও খেলছেন। অ্যাথলেটিকসেও বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণ রয়েছে।  

বিদ্যালয়ের শরীরচর্চা শিক্ষক ও দক্ষ কোচদের অধীনে প্রশিক্ষণ নেওয়া খেলোয়াড়রা বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড (বিসিবি) ও বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশনের (বাফুফে) বিভিন্ন বয়সভিত্তিক, যেমন অনূর্ধ্ব-১৪ ও অনূর্ধ্ব-১৬, জেলা ও আঞ্চলিক ক্যাম্পে সুযোগ পাচ্ছে। ফলে চাঁদপুর থেকে জাতীয় পর্যায়ের খেলোয়াড় তৈরির ক্ষেত্রেও বিদ্যালয়টি একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রবেশদ্বার বা ভূমিকা হিসেবে কাজ করছে।

গৌরবের সেই মাঠ এখন সংকটে , বিদ্যালয় বর্তমান ৬ শতাংশের মাঠ রয়েছে শিক্ষার্থী রয়েছে মোট ৮৫০ জন। আউটডোর ইনডোর গেমসে জন্য  খেলাধুলার সামগ্রী থাকলেও মাঠ সংকটের কারণে অনুশীলন করতে পারছে না শিক্ষার্থীরা।

গনি মডেল উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক নাজির আহমেদ বলেন, ক্রীড়া অঙ্গনে বিদ্যালয়টির গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায় রয়েছে, যা বলে শেষ করা যাবে না। শতবর্ষ পেরিয়ে আসা এই প্রতিষ্ঠানটি বর্তমানে মাঠ সংকটে ভুগছে।

বিদ্যালয়ে বর্তমানে একটি নতুন বহুতল ভবন নির্মিত হয়েছে। ফলে বিদ্যালয়ের জায়গার ব্যবহার আরও সীমিত হয়েছে। প্রধান শিক্ষক বলেন, বিদ্যালয়ের পুরোনো ভবনগুলো ভেঙে জায়গাটি পরিকল্পিতভাবে সংস্কার করে মাঠের পরিসর বাড়ানো গেলে গনি মডেল উচ্চ বিদ্যালয়ের পুরোনো ক্রীড়া ঐতিহ্য আবারও ফিরে আসতে পারে।

অর্থাৎ, যে মাঠ একসময় চাঁদপুরের খেলোয়াড় তৈরির অন্যতম প্রধান কেন্দ্র ছিল, সময়ের পরিক্রমায় সেই মাঠের পরিসরই এখন সংকুচিত হয়ে পড়েছে। অথচ এই বিদ্যালয়ের শত বছরের ক্রীড়া ঐতিহ্য, নিয়মিত ক্রীড়া প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ এবং জেলা থেকে জাতীয় পর্যায়ে খেলোয়াড় তৈরির ধারাটি এখনো অব্যাহত রয়েছে।

Tags:

সর্বশেষ

Calendar
Mon Tue Wed Thu Fri Sat Sun
 1234
567891011
12131415161718
19202122232425
262728293031  
Scroll to Top