নুরুন্নবী চৌধুরী হাছিব :
একটি প্রতিষ্ঠানের ইতিহাস শুধু তার প্রতিষ্ঠার সাল, ভবনের সংখ্যা কিংবা পরীক্ষার ফলাফলে লেখা থাকে না। সেই ইতিহাস তৈরি করেন কিছু মানুষ—তাদের মেধা, শ্রম, সততা, নেতৃত্ব ও ভালোবাসা দিয়ে। সময়ের সঙ্গে অনেকের নাম হারিয়ে যায়, আবার কেউ কেউ থেকে যান প্রতিষ্ঠানের স্মৃতিতে, মানুষের হৃদয়ে।
অধ্যাপক এ ডব্লিউ মো. তোয়াহা মিয়া ছিলেন তেমনই একজন মানুষ। শিক্ষক হিসেবে তিনি যেমন শিক্ষার্থীদের আলোর পথ দেখিয়েছেন, তেমনি প্রশাসক হিসেবে চাঁদপুর সরকারি কলেজের গুরুত্বপূর্ণ একটি সময়ে নেতৃত্ব দিয়েছেন। অথচ চাঁদপুর সরকারি কলেজের ইতিহাসে তাঁর অবদানের স্থায়ী কোনো স্মারক আজও নেই। বিষয়টি সত্যিই ভাবার মতো।
চাঁদপুর সরকারি কলেজের সঙ্গে তোয়াহা মিয়ার সম্পর্ক ছিল বিশেষ। ১৯৪৬ সালের ১ জুন চাঁদপুর কলেজের যাত্রা শুরু। দীর্ঘ ৩৩ বছর ৯ মাস পর ১৯৮০ সালের ১ মার্চ কলেজটি সরকারি হয়। একই বছরের ১১ ডিসেম্বর অধ্যক্ষ হিসেবে যোগ দেন এ ডব্লিউ মো. তোয়াহা মিয়া। এর আগে তিনি কুমিল্লার ভিক্টোরিয়া কলেজের অধ্যক্ষ হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তার পরিচয়ের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়গুলোর একটি হলো, চাঁদপুর সরকারি কলেজের একজন প্রাক্তন শিক্ষার্থী থেকে প্রথম অধ্যক্ষ হন তিনি।
১৯৮০ সালের ১১ ডিসেম্বর থেকে ১৯৮৯ সালের ২৬ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত প্রায় আট বছর তিনি অধ্যক্ষের দায়িত্ব পালন করেন। কলেজটি সরকারি হওয়ার পরের গুরুত্বপূর্ণ সময়ে তার নেতৃত্বে একাডেমিক ও অবকাঠামোগত উন্নয়নে নানা উদ্যোগ নেওয়া হয়। ফলে চাঁদপুর সরকারি কলেজের বিকাশের ইতিহাসে তার ভূমিকা আলাদাভাবে উল্লেখ করার দাবি রাখে।
শুধু প্রশাসনিক কাজেই তিনি থেমে থাকেননি। ১৯৮৮ সালে কলেজের ৪২ বছর পূর্তি উপলক্ষে প্রথম পূর্ণমিলনী আয়োজনেও তার আন্তরিক ভূমিকা ছিল। আজ চাঁদপুর সরকারি কলেজে প্রাক্তন শিক্ষার্থীদের যে মিলনমেলার সংস্কৃতি দেখা যায়, তার শুরুর ইতিহাসেও এই উদ্যোগের কথা স্মরণ করা যায়।
শিক্ষক মো. তোয়াহা মিয়া:
অধ্যাপক এ ডব্লিউ মো. তোয়াহা মিয়া ছিলেন মেধাবী শিক্ষার্থী এবং নিবেদিতপ্রাণ শিক্ষক। ১৯৫০ সালে উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষায় তিনি মেধাতালিকায় ১৭তম স্থান অর্জন করেন। পরে জগন্নাথ কলেজ, কুমিল্লা পলিটেকনিক কলেজ, কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজ এবং চাঁদপুর সরকারি কলেজে শিক্ষকতা করেন।
তবে তাঁর শিক্ষকতার সবচেয়ে বড় পরিচয় সম্ভবত শিক্ষার্থীদের প্রতি তাঁর মানবিক আচরণ। দরিদ্র ও মেধাবী অনেক শিক্ষার্থীকে তিনি নিজের বাসায় রেখে পড়াশোনার সুযোগ দিয়েছেন। কারও থাকার ব্যবস্থা করেছেন, কারও খাবারের দায়িত্ব নিয়েছেন, আবার কারও পড়াশোনার খরচে আর্থিক সহায়তা করেছেন।
একজন শিক্ষক শ্রেণিকক্ষে পাঠদান করেন, এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু একজন শিক্ষক যদি কোনো শিক্ষার্থীর কঠিন সময়ে পাশে দাঁড়ান, তার ভবিষ্যৎ গড়ার দায়িত্ব নিজের কাঁধে নেন, তখন সেই শিক্ষক আর শুধু শিক্ষক থাকেন না; হয়ে ওঠেন একজন অভিভাবক। তোয়াহা মিয়ার শিক্ষার্থীদের স্মৃতিচারণে এমন একজন অভিভাবকের ছবিই পাওয়া যায়। তাঁর স্ত্রী জাহানারা বেগমও স্বামীর শিক্ষা ও মানবিক কাজের সবসময়ের সহযাত্রী ছিলেন।
কেন থাকবে না তাঁর স্মৃতি?
১৯৯৭ সালের ২৯ সেপ্টেম্বর অধ্যাপক এ ডব্লিউ মো. তোয়াহা মিয়া পৃথিবী ছেড়ে চলে যান। প্রায় তিন দশক হয়ে গেল। কিন্তু প্রশ্নটি এখনও রয়ে গেছে, চাঁদপুর সরকারি কলেজের প্রাক্তন শিক্ষার্থী থেকে প্রথম অধ্যক্ষ হওয়া একজন মানুষের নামে কলেজে একটি স্থায়ী স্মৃতিও কি থাকতে পারে না? একটি ভবন, মিলনায়তন, পাঠাগার, শ্রেণিকক্ষ কিংবা কোনো গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার নাম তাঁর নামে রাখা যেতে পারে। সম্ভব হলে তাঁর নামে একটি স্মারক ফলকও স্থাপন করা যেতে পারে।
এ ধরনের উদ্যোগ কোনো ব্যক্তি বা পরিবারের জন্য সম্মান দেখানোর মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। এটি প্রতিষ্ঠানের ইতিহাস সংরক্ষণেরও একটি উপায়। একটি ভবনের নাম যখন কোনো শিক্ষাবিদের নামে রাখা হয়, তখন প্রতিদিন সেই নামটি শত শত শিক্ষার্থী দেখে। একসময় প্রশ্ন আসে—কে ছিলেন তিনি? তখনই ইতিহাস নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছে যায়।
তোয়াহা মিয়ার জন্মস্থান চাঁদপুর জেলার ফরিদগঞ্জ উপজেলার ২নং বালিথুবা (পূর্ব) ইউনিয়নের সরখাল গ্রামে তাঁর স্মৃতি সংরক্ষণের কিছু উদ্যোগ রয়েছে। ১৯৯৪ সালে সেখানে নির্মিত হয়েছে ‘এ ডব্লিউ মো. তোয়াহা মিয়া সেতু’। ২০০৫ সালে সরখাল ওলিভ তরুণ সংঘের উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে ‘এ ডব্লিউ মো. তোয়াহা মিয়া স্মৃতি পাঠাগার’। এই পাঠাগারকে ঘিরে প্রতিবছর শিক্ষা ও সাংস্কৃতিক কার্যক্রমও অনুষ্ঠিত হয়। কিন্তু চাঁদপুর সরকারি কলেজে তাঁর নামে একটি স্থায়ী স্মৃতি তৈরি হলে সেটি হবে তাঁর জীবনের সঙ্গে সবচেয়ে সামঞ্জস্যপূর্ণ স্বীকৃতি। কারণ তিনি শুধু এই কলেজের অধ্যক্ষ ছিলেন না, তিনি ছিলেন এই কলেজেরই একজন প্রাক্তন শিক্ষার্থী।
ইতিহাসের কাছে আমাদের দায়:
আমরা প্রায়ই বলি, গুণী মানুষকে সম্মান করতে হবে। কিন্তু সম্মান শুধু ফুল দেওয়া বা স্মরণসভা আয়োজনের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলে তা কতটা স্থায়ী হয়? একটি প্রতিষ্ঠানের দেয়ালে, ভবনের নামফলকে কিংবা পাঠাগারের দরজায় কোনো গুণী শিক্ষকের নাম লিখে রাখা অনেক সময় তার চেয়েও বেশি কার্যকর স্মৃতি হয়ে উঠতে পারে। অধ্যাপক এ ডব্লিউ মো. তোয়াহা মিয়ার ক্ষেত্রে এমন একটি উদ্যোগ নেওয়া হলে তা হবে চাঁদপুর সরকারি কলেজের নিজের ইতিহাসকেই সম্মান জানানো। তাই প্রত্যাশা, চাঁদপুর সরকারি কলেজ কর্তৃপক্ষ, প্রাক্তন শিক্ষার্থী এবং সংশ্লিষ্ট সবাই বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করবেন। অধ্যক্ষ এ ডব্লিউ মো. তোয়াহা মিয়ার নামে কলেজে একটি ভবন, মিলনায়তন, পাঠাগার, শ্রেণিকক্ষ কিংবা অন্তত একটি স্থায়ী স্মারক করা হোক।
মানুষ চলে যায়, প্রতিষ্ঠান থেকে যায়। কিন্তু প্রতিষ্ঠানের ইতিহাস বেঁচে থাকে মানুষের কর্মের মধ্য দিয়ে। তোয়াহা মিয়ার মতো মানুষদের স্মৃতি সংরক্ষণ মানে শুধু অতীতকে সম্মান করা নয়; বরং ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে বলা, এই মানুষটি তোমাদের জন্য কাজ করেছিলেন, শিক্ষার জন্য কাজ করেছিলেন, এই প্রতিষ্ঠানটির জন্য কাজ করেছিলেন। চাঁদপুর সরকারি কলেজে অধ্যক্ষ তোয়াহা মিয়ার নামে কিছু হোক। সেটি শুধু একজন প্রয়াত শিক্ষকের স্মৃতি নয়—হোক চাঁদপুরের শিক্ষা-ইতিহাসের একটি স্থায়ী অধ্যায়।
লেখক: সাংবাদিক ও লেখক।
সাধারণ সম্পাদক, সরখাল ওলিভ তরুণ সংঘ, ফরিদগঞ্জ, চাঁদপুর।
ই-মেইল: nurunnabyc@gmail.com
