১৪ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ

অপেক্ষার প্রহরে বিধ্বস্ত

কতটা প্রহর আমি অপেক্ষায় কাটাব
আর কতটা প্রহর এভাবেই চলে যাবে!
একপশলা বৃষ্টি তারপর রোদ্দুর
বকুলতলায় কুড়ানো ফুলগুলোর সঙ্গ
আমাকে বারণ করে ফিরে আসতে।

একমুঠো বকুলের মালাটি মেলে ধরি,
তাজা বকুলের ঘ্রাণ এখনও বাকি আছে।
বিশ্বাস করো হে সখী– আমি বকুলতলায় আছি
এবং এখানেই অপেক্ষায় থাকব যদি ধরা না দাও।

সেই কুসুমভোরে নগ্নপায়ে শিশির মাড়িয়েছি,
কতটা কাঁটা বিঁধেছে তার ইয়ত্তা নেই,
একগ্লাস পানিতে শরীরটা এখনো ফুরফুরে
কিন্তু সূর্যটা আমাকে বিরক্ত করেই চলছে,
তবুও আমি অপেক্ষায় আছি পথপানে।

সেদিন বলেছিলে বকুলের মালায় সাজবে
টিকলি আর টায়রা বানিয়ে দিতে হবে,
আর নূপুর পেলে নৃত্যগীতে মন ভরাবে।
আমি তাই প্রতিরাতেই স্বপ্ন দেখি
ভোরের পাখি হয়ে মুঠোমুঠো বকুল তুলি
মালায় জড়িয়ে রাখি সবগুলো অতি যত্নে,
কিন্তু অপেক্ষার প্রহরে আমি আজ বিধ্বস্ত।

একটি ক্যাকটাসের জন্য

বেলকনির নিশ্চল টবে ঠায় দাঁড়িয়ে
একচিলতে মুগ্ধ হাসিতে প্রাণ জুড়াও;
অতি সঙ্গোপনে বেড়েই চলেছে তোমার ক্ষুরধার কাঁটাগুলো;
স্পর্শে মৃদু অনুভূতি কেড়ে নিই,
অজানা ইশারায় কেঁপে উঠে শিরদাঁড়া রাত্রির এক নিবেদন।

গহীন অরণ্যে আলো আঁধারের লুকোচুরি;
শানবাঁধানো ঘাটে নিস্তব্ধতায় এই নিভৃতচারী
পদ্মফুলের নির্যাসে নির্মল আনন্দে সদা মাতে।
তারপর আনমনে নয়নযুগলে ধরা পড়ে;
অনিন্দ্য রাজকন্যার রূপ।
চৈতী হাওয়া জড়িয়ে স্বাগত জানাই;
পদ্মফুলেল উষ্ণীশ পরিয়ে, দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান।

অতি যত্নে রাখি; রৌদ্র-জল অবারিত জোছনার আভায়,
বিহঙ্গের আনাগোনায় কোণঠাসা প্রাণে;
মায়াবী জাল জেগে থাকে,
টবের বৃত্তপথ পরিভ্রমণে মশগুল ত্রিনয়ন।
একটি ক্যাকটাসের জন্যে এতদূর।

অর্ধযুগের নিরন্তর ঘণ্টাধ্বনি থেমে যায় একদিন
রৌদ্রতাপের বিভীষিকায়, অসাড় কাঁটাগুলো শুধুই জেগে আছে,
অভিমানী স্মৃতিচিহ্ন বিদ্ধ করে সর্বদা।
নিষ্পলক নয়নে নিত্য চেখে রাখি,
একচিলতে হাসির জন্যে স্মৃতিরাজ্যে উপনিবেশ;
জেগে থাকুক আর কিছুকাল।

বিশুদ্ধ মাল্যদান

তুমি নেই তাই ভাবনাগুলো এলোমেলো
অবিন্যস্ত ঘরে শুধুই নীরবতা।
সুরের ধারায় তান, সে তো হারিয়েছি,
দাঁড়কাকের সাথে এখন বেসুরে কণ্ঠমিলন।
প্রজাপতি উড়ে নিঃশব্দে চলে যায়
অ্যাকুরিয়ামে অম্লযোগের বড়ই অভাব।
মাছগুলোয় ফ্যাকাসে আস্তরণ,
মায়াবী স্পর্শের বড়ই আকাল।

বিনি সুতোয় গাঁথা মালাটি আর কতকাল
শুধুই নির্জীব সাক্ষী হবে?
ফুলেরাও অভিমানে সুঘ্রাণ ছড়ায় না,
সবই তোমার পথপানে আশায় বসতি।

মাকড়সার জালে চিত্রলিপির প্রতিচ্ছবি
তোমার নামটি যেন শোভা পায়।
অমিত্রাক্ষর ছন্দে পদ্যগুলো দেয়ালে ঝুলে,
আয়নায় দীর্ঘশ্বাসে ভাসে বিকৃত প্রতিকৃতি।
শুকনো হাসি আর প্রাণে লাগে না,
চাই তোমার সাথে বিশুদ্ধ মাল্যদান।

নিদ্রাঝড়ের আবির্ভাব

দখিনা পবন বয়, আঙিনায় বিছানা পাতি,
এলিয়ে তপ্তদেহে শিরশিরে ছোঁয়া,
একখণ্ড মেঘ রাতের আকাশে
উন্মাদ নৃত্যরত।

কখনো সন্ধ্যাতারার মিটিমিটি হাসি,
আঁধারের মাঝে জেগে থাকা প্রদীপ্ত চেরাগদানি,
জোছনার সম্মোহনী খেলায় আলো আঁধারীর উচ্ছ্বল উৎসব।

তাপদাহে যে ব্যথিত হৃদয়ে দিবাকর রুষ্ট,
কপোলে তারই ছাপ জেগে থাকে
অঝোর ধারায় সৃষ্ট সুবিশাল ক্যানভাসে।

মেঘেরা উড়ে যায় আকাশে বাতাসে
ভেলায় পরীদের জলকেলি,
ঘনমেঘে ন্যুব্জ আকাশ ভেঙে পড়ে
আমার আঙিনায়,
দেহ মাঝে তারই শিহরণ অনন্তযৌবনারূপী।

বৃষ্টিজল আমার হয়ে অবারিত ঝরে,
ফোঁটায় ফোঁটায় অকৃত্রিম সুরের তান
গভীর রাতের দীর্ঘতাভেদে মিলিয়ে যায়
আখিঝুরে প্রচ্ছন্ন নিদ্রাঝড়ের আবির্ভাব।

সেই ভোরের প্রতীক্ষায়

যদি এমন একটি ভোর হতো—
কুয়াশা বিন্দু বিন্দু করে জমে থাকবে
কচি ঘাসের ডগায়, আবার নেচে উঠবে
প্রভাতের গানে, সূর্যত্যাজে পালাবে না।
যদি পাখিরা আগের মতোই উড়ে যেত খুব স্বাধীনভাবে,
কর্ণকুহরে ঝাপটানো ধ্বনিতে সেই আলোড়ন যদি আবার হতো
তবে পৃথিবীতে সেই সময় হবে শ্রেষ্ঠ ভোর।

যদি হ্রদের ওপাশে হেলানো সেই বিকেলে
সূর্যটা ডুবে যেতে যেতে তাকিয়ে থাকতো
এই পৃথিবীর কত শত মুখগুলোতে–
যেখানে প্রচ্ছদের মতো ছবি ভেসে উঠে
কিন্তু হাসতে পারে না বোবাকান্নায়।
শতদিন খাঁচায় পাখি তো থাকে প্রাণহীন
দূরের নীলিমায় দৃষ্টিতে ভাসে উড়ন্ত শৈশব
সেই পাখিটিও চায় না হেরে যেতে
সময়ের প্রতীক্ষায় বাসা বুনে যেতে থাকে।

যদি কখনো চাঁদটি আপন প্রিয়ার মতো
হঠাৎ আলোয় ভরে দিতো আলতো করে,
হ্রদের জলে জ্যোৎস্নায় পাহাড়ের কোলজুড়ে
মেঘের অবকাশ হতো শ্রেষ্ঠ পূর্ণিমার গল্প।

যদি মুকুলিত বৃক্ষটি আর না কাঁদতো—
এই অসময়ে বোনা ফসলের ক্ষেতে পঙ্গপাল
না এসে যদি ফিরে যেত, তবে খোলা চিঠি
মহারাজার কাছে সেই ভোরের প্রতীক্ষায়–
শুধরে দাও এই পৃথিবী।।

মোনালিসা

তোমার চাঁদমুখ আজো অনির্বাণ,
তুমি অসংখ্য তারার রাণী,
হৃদয়ে অকৃত্রিম হাসির ঘূর্ণিবাতে ক্ষণিকের তরে
মিলিয়ে যাওয়া একফালি চাঁদের জোছনা।
মিটমিটে আলোয় আঁধারের বুকে অহর্নিশি
দৃপ্তপদক্ষেপের মন্ত্রণা।

তুমি আজো প্রাণে প্রাণে ছন্দবদ্ধ পঙক্তি রূপে
অনিঃশেষ কাব্যরসের সেরা যোজনা।
কবিতায় সুদৃঢ় শব্দচয়নে, বলিষ্ঠ উচ্চারণ
আর হৃদয় কাঁপানো অবিরাম আবৃত্তির
অনন্য প্রেরণা।

তুমি কবির হারানো সুপ্ত মনোবাঞ্ছায়
অকাল পদ্যে সুরলহরীর ক্রমাগত আবির্ভাব।
নিদারুণ যন্ত্রণার সাক্ষী, সদা জাগ্রত
তরুছায়ায় নির্বাক শার্দূল।

তুমি ক্ষীণমনে কুম্ভীরাশ্রুর স্রোতধারায় তীব্র প্রতিবাদ,
পঙ্কিল মনুষ্যত্ব নাশিনী দোর্দণ্ড তেজস্বিনীর
প্রকাণ্ড হুংকার।
তুমি জেগে আছো দশদিগন্তে কোটি মানবমনে,
ভুবনজয়ী হাসিটুকু ফুলের পাপড়িরূপে
যেন চিরঅম্লান অনিঃশেষ।

Tags:

সর্বশেষ

Calendar
Mon Tue Wed Thu Fri Sat Sun
 123456
78910111213
14151617181920
21222324252627
282930  
Scroll to Top