১৫ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ

মো. মিজানুর রহমান : 

শিক্ষা কোনো বিচ্ছিন্ন ব্যবস্থা নয়; এটি সামাজিক মূল্যবোধ, প্রশাসনিক নীতি এবং মানবিক অনুভূতির এক সুবিন্যস্ত সমন্বয়। একজন শিক্ষকের বিদ্যালয়ের উপস্থিতি কেবল উপস্থিতি খাতায় একটি স্বাক্ষর বা নির্ধারিত সময় পার করা নয়; এটি পরম মনোযোগ, মেধা এবং মানসিক উপস্থিতির দাবি রাখে। কিন্তু শিক্ষক দিনশেষে একাধারে একজন সামাজিক ও পারিবারিক মানুষ। নিজের সন্তান বা পরিবারকে ঝুঁকিপূর্ণ কিংবা নিরাপত্তাহীন অবস্থায় রেখে কোনো শিক্ষকের পক্ষে শ্রেণিকক্ষে পূর্ণ মনোযোগ দেওয়া সম্ভব নয়। পেশাগত দায়িত্বের বাইরেও যে তার একটি মানবিক সত্তা এবং গভীর পারিবারিক দায়বদ্ধতা রয়েছে—এই মৌলিক বিষয়টি উপলব্ধি করা যেকোনো শিক্ষাগত সংস্কারের প্রথম শর্ত হওয়া উচিত।

শিক্ষাব্যবস্থার গুণগত মান বৃদ্ধি কিংবা পেশাগত সততা নিশ্চিত করার নামে যখন কেবল শিক্ষকের ওপর প্রশাসনিক কড়াকড়ি আরোপ করা হয় অথবা তাকে প্রযুক্তি থেকে বিচ্ছিন্ন করার চেষ্টা করা হয়, তখন সমস্যার মূল কারণ আড়ালেই থেকে যায়। কেবল শিক্ষককে নজরদারিতে রেখে সার্বিক শিক্ষার মান উন্নয়ন সম্ভব নয়, যদি না পুরো প্রশাসনিক কাঠামোতে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা হয়। সার্বিক অসৎ লেনদেন, স্বজনপ্রীতি ও দুর্নীতির সংস্কৃতি বন্ধ করে প্রশাসনিক সততা প্রতিষ্ঠা করা গেলে প্রতিষ্ঠানে এমনিতেই একটি সুস্থ ও দায়িত্বশীল পরিবেশ গড়ে ওঠে। পর্যাপ্ত মূল্যায়ন, উপযুক্ত সামাজিক মর্যাদা ও নিরাপত্তা পেলে জবাবদিহিতা বাইরে থেকে চাপিয়ে দিতে হয় না—তা শিক্ষকের ভেতর থেকেই স্বতঃস্ফূর্তভাবে উঠে আসে।

এই প্রেক্ষাপটে বিদ্যালয়ে শিক্ষকদের প্রযুক্তি ও স্মার্টফোন ব্যবহারের সামাজিক ও পেশাগত যৌক্তিকতা এবং এর ভারসাম্যমূলক প্রয়োগ পর্যালোচনা করা যেতে পারে।

পরিবারের জরুরি পরিস্থিতি (যেমন অসুস্থ সন্তান বা বৃদ্ধ পিতা-মাতা) সম্পর্কে সচেতন থাকার সুযোগ প্রতিটি পেশাজীবীর মৌলিক অধিকার। এই ন্যূনতম মানসিক নিশ্চিন্ততা শিক্ষককে শ্রেণিকক্ষে উদ্বিগ্নতামুক্ত রেখে পাঠদানে নিবিষ্ট হতে সাহায্য করে। আধুনিক যুগে জ্ঞানচর্চা কেবল নির্দিষ্ট পাঠ্যবইয়ের পাতায় সীমাবদ্ধ নয়। শ্রেণিকক্ষে জটিল কোনো বিষয়কে ভিজ্যুয়াল উপস্থাপনা, তাৎক্ষণিক চিত্র বা প্রাসঙ্গিক তথ্যের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের কাছে সহজবোধ্য করে তুলতে প্রযুক্তি এক অপরিহার্য মাধ্যম।

আধুনিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে একাডেমিক নোটিশ, জরুরি প্রশাসনিক নির্দেশনা ও তথ্য আদান-প্রদানে প্রযুক্তি সময় সাশ্রয় করে এবং প্রাতিষ্ঠানিক গতিশীলতা বৃদ্ধি করে। প্রযুক্তির সুবিধার পাশাপাশি এর অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহারের ঝুঁকিও এড়ানো যায় না। শ্রেণিকক্ষে পাঠদানকালে অনাকাঙ্ক্ষিত কল, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দীর্ঘ সময় ব্যয় বা ব্যক্তিগত যোগাযোগ শিক্ষকের পেশাদারিত্বকে ক্ষুণ্ন করে এবং শিক্ষার্থীদের মনোযোগে ব্যাঘাত ঘটায়। শিক্ষক যখন শ্রেণিকক্ষে অপ্রয়োজনীয় কাজে মোবাইল ব্যবহার করেন, তখন তা শিক্ষার্থীদের মধ্যেও নিয়ম অমান্য করার মানসিকতা তৈরি করে।

সুতরাং, সমাধান ঢালাও নিষেধাজ্ঞায় নয়; বরং একটি পরিপক্ক ‘পেশাগত আচরণবিধি’ অনুসরণের মধ্যে নিহিত। পাঠদান চলাকালীন ডিভাইস সাইলেন্ট বা ভাইব্রেশন মোডে থাকবে, যাতে শিক্ষক জরুরি বার্তার সংকেত পান অথচ ক্লাসের স্বাভাবিক পরিবেশ ব্যাহত না হয়। পরম জরুরি ক্ষেত্রে সহকর্মীদের সমন্বয়ে বা ক্লাসের স্বাভাবিক গতি রক্ষা করে স্বল্প সময়ের জন্য সংযোগ রক্ষা করা যেতে পারে।

প্রযুক্তি কেবল জ্ঞান সম্প্রসারণ ও শিক্ষা সহায়তায় ব্যবহৃত হবে; ব্যক্তিগত বিনোদনের কাজে নয়।

আরো যাহা প্রয়োজন—শিক্ষকের সুরক্ষা ও সামাজিক মর্যাদার অপরিহার্যতা। সাম্প্রতিক সময়ে শিক্ষাখাতের অন্যতম বড় সংকট হলো শিক্ষকের সামাজিক নিরাপত্তা ও কাঠামোগত সুরক্ষার অভাব। সামান্য প্রশাসনিক অসন্তোষ বা বাহ্যিক প্রভাবে যখন-তখন শিক্ষককে হেনস্তা করা কিংবা তার কাজে অহেতুক হস্তক্ষেপ করার প্রবণতা আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে। একজন শিক্ষক যদি নিজের কর্মক্ষেত্রে নিরবচ্ছিন্ন নিরাপত্তাহীনতা ও মর্যাদাহানির ভয়ে থাকেন, তবে তার পক্ষে স্বাধীন ও বুদ্ধিদীপ্ত পাঠদান অসম্ভব হয়ে পড়ে।

জাতীয় পর্যায়ে ‘শিক্ষক সুরক্ষা আইন’ প্রণয়ন এবং এর কার্যকর বাস্তবায়ন এখন সময়ের দাবি। একজন শিক্ষককে কেবল আইনের মাধ্যমে শাসন করার মানসিকতা থেকে বেরিয়ে এসে তাকে উপযুক্ত আইনি সুরক্ষা, কাজের পরিবেশ এবং সামাজিক মর্যাদা দিতে হবে। যে সমাজ শিক্ষককে অপমানিত হতে দেখে, সে সমাজ কখনো মেধা ও মননে সমৃদ্ধ হতে পারে না। 

একটি উন্নত শিক্ষা ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে প্রয়োজন তিনমুখী সমন্বয়—প্রশাসনিক সততা ও স্বচ্ছতা, শিক্ষকের আইনি ও সামাজিক সুরক্ষা এবং প্রযুক্তির সুনিয়ন্ত্রিত ও মানবিক প্রয়োগ। শিক্ষককে সন্দেহ বা কড়াকড়ির চোখে না দেখে, তাকে একজন মর্যাদাশীল ও দায়িত্বশীল অংশীদার ভাবলেই কেবল শিক্ষার প্রকৃত রূপান্তর সম্ভব। শিক্ষক নিরাপদ ও সম্মানিত থাকলে, সমাজও নিশ্চিতভাবে একটি আলোকোজ্জ্বল ভবিষ্যৎ উপহার পাবে।

Tags:

সর্বশেষ

Calendar
Mon Tue Wed Thu Fri Sat Sun
 123456
78910111213
14151617181920
21222324252627
282930  
Scroll to Top