১০ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ

নিমগ্ন দুপুর—এর কবিতাগুচ্ছ

আদিম আঁধার

আমি এসেছি লবণাক্ত অন্ধকার থেকে
যেখানে সৃষ্টির আদিম ক্রন্দন-
সমুদ্রের গর্ভে ঢেউ হয়ে আত্মপ্রকাশ করেছিল!

সেদিন দুটি শরীর তাদের শঙ্কা ভুলে
আমাকে তুলে এনেছিল আলোয়
অথচ তারা জানতোই না,
আমি আলো মানি না-
আমি তো সেই আদিম আঁধার—
যে ঘরে জন্মায়, কিন্তু ঘর চিনে না।

অতঃপর এক ফোঁটা জলের অণু থেকে আমি
ক্রমশ রূপ নিয়েছিলাম মানব ছায়ায়,
চোখে ধারণ করে মহাশূন্যের নীহারিকা
বুকে নিয়ে নিঃশব্দ স্রোতের তান-
তখনও আমার স্মৃতিতে দগদগ করছিল
তপ্ত মারিনার অতল-
যেখানে জন্ম নয় কেবল আবর্তিত হয়
এক দূর্ভেদ্য অনন্ত চক্র!

তাই আমি কোনো ধর্মের উত্তরসূরি নই
নই কোনো ভবিষ্যদ্বাণীর অক্ষর-
আমি কেবলই এক ঢেউ
যে বারবার ফিরে আসে আলোর মুখোমুখি
হয়ে আবার হারিয়ে যায় নিঃসঙ্গ গহ্বরে!

এভাবেই সূর্য আমাকে প্রতিদিন দহন করে
আর চাঁদ নিঃশব্দে করে শীতল
তারপরও আমার চিহ্ন মুছে যায় না!

আমি তো সেই মহাজাগতিক প্রশ্ন
যে নিজেই নিজের উত্তর-
তাই তো যতবার ডুবে গেছি মৃত্যুর গহীনে
ততবারই সমুদ্র আমাকে-
ফিরিয়ে দিয়েছে নতুন নামে।

আমি জানি-
প্রতিটি জন্মই আমার মৃত্যু,
প্রতিটি মৃত্যুই— এক অনন্ত আহ্বান,
যেখানে একদিন ঠিক ফিরতে হবে
জলে মিশে যাওয়া সেই কণা হয়ে-
যাকে ঈশ্বর করুণা করেও ভালোবাসেনি!

শহরের চিৎকার

পথে এলোমেলো হাঁটতে হাঁটতে দেখি
একটি শিশু যীশুর মূর্তি গলিয়ে
বানাচ্ছে একটি ক্ষুধার্ত অস্ত্র-
আর প্রার্থনার বদলে কোনো এক বৃদ্ধ
হাতে প্ল্যাকার্ড নিয়ে দাঁড়িয়ে-
তাতে লেখা—
“পৃথিবী বিক্রি হবে”

এই শহরে মূলত সাইরেন নয়
আহত চিৎকারই দেয় সংকেত-
এখানে গুলির সুর হলো গান
আর শিশুদের ঘুম পাড়ায়
মরিচ পোড়া ধোঁয়া!

কারণ ঈশ্বর এখন বক্তৃতার মঞ্চে
কর্পোরেট সুরে ব্যাখ্যা দেন মুক্তির সংজ্ঞা—
“বেচা-কেনা হোক বিশ্বাসে।”

তুমি বলো,
এই বাজারে স্বর্গও কি
ডিসকাউন্টে আসে?

চলো তবে—
শেষবারের মতো নিঃশ্বাস নিই
কোনো এক মৃত কবির বুকে-
যে কবিতার বদলে
চেয়েছিল শুধু একটু মানবতা।

এই হেমন্তে

তোমার অভাবে আমার ভেতর
হেমন্ত নেমেছে-
পাতাঝড় হয় প্রতিটি নিঃশ্বাসে
বুকের ভেতর ঝরে পড়ে অপেক্ষা
ধুলো হয়ে ধ্বংস হয়ে।

চোখের পাতায় জমে ওঠে খরা
সেখানে কান্না ফোটে না আর-
তুমি নেই বলে জলও হারিয়ে
ফেলে নিজের পথ।

সব শব্দ এখন বোবা
সব গান নিঃশব্দ শোক
সব পথ হেঁটে যায় কেবলই
তুমিহীনতার দিকে!

অথচ তুমি থাকলে আলতো ছোঁয়াতেও
ভেঙে যেত সব দুর্যোগ-
তোমার কণ্ঠে আমার মৃত কবিতারাও
জেগে উঠতো সুর হয়ে!

জানি, তুমি মৌমাছির মতো-
ফুল থেকে ফুলে উড়ে বেড়াও
আর আমি?
শুধু একগুচ্ছ অব্যবহৃত ভালোবাসা-
না ফোটা গোলাপ-
যার পাঁপড়িতে শুধুই তোমার নাম লেখা!

তুমি কি আসবে না একদিন
এই নিঃস্ব আলয়ে?
তুমি কি পারো না
এই ভাঙা বুক জুড়ে
ঝড়োবৃষ্টির মতো নামতে?

যদি আসো-
তোমার ছোঁয়ায়
সব দুর্ভিক্ষ গলে যাবে
পুড়ে গিয়ে সব হাহাকার-
ভালোবাসা হয়ে উঠবে আগুন
একান্ত দুপুরে!

অনধিকার

তোমার কাছ থেকে ফিরে আসতে আসতে
বুঝলাম, আমি তোমাকে রেখে আসিনি
বরং তোমার নামে লেখা আমার সমস্ত
অধিকার ফিরিয়ে দিয়েছি।

আজ থেকে তোমার সমস্ত সকাল
তোমারই থাকুক, কোনো বিকেলের অজুহাতে
তোমার দরজায় আমি আর ফিরব না।

বিদায়েরও একটা গন্ধ থাকে-
আমি আজকাল সেই গন্ধ নিয়েই ঘুমোই
বালিশে মুখ রাখলেই মনে হয়-
নিঃশব্দে আমার নাম মুছে যাচ্ছে
কারো শেষ চাওয়া থেকে।

আমাদের গল্পের কোনো সমাপ্তি নেই
আছে শুধু নীরবতার দীর্ঘ অনুচ্ছেদ।
যেখানে উচ্চারণহীন বাক্যগুলো
প্রতিদিন একটু একটু করে পাথর হয়ে যায়।

ভালোবাসা আসলে বড়ই অদ্ভুত-
যাকে নিজের বলে ডাকার সাহস হয় না,
তার জন্যই মানুষ সবচেয়ে দীর্ঘ প্রার্থনা করে!

তাই তোমার নাম আমি আর ঠোঁটে আনব না
কারণ নাম উচ্চারণ করলেই হৃদয় বিশ্বাস করে
ফেলে, তুমি এখনও আছ।

আমি বরং তোমাকে অনধিকারেই
রেখে দেব, যেখানে স্মৃতিরা চিৎকার
করে না শুধু নীরবতায় জমাট বাঁধে।

এরপর যদি কোনোদিন আমাদের না-ঘটা
জীবনের সাথে হঠাৎ তোমার দেখা হয়ে যায়
একবার শুধু তাকিয়ে দেখো…
সেখানেও আমি থাকব দাঁড়িয়ে
তোমাকে নয়-
অবশিষ্ট আমিকেই বিদায় জানাতে!

অনুতাপ

আইজকাইল নিজের নাম হুনলেই চমকাই
আইজকাইল নিজেরেও বড় অচেনা লাগে
মনে অয় কেউ বুঝি পুরান ক্ষতগুলারে
আবার নাম ধইরা ডাকতাছে…

নিজের লগে যে কত রকম চুক্তি করছি…
তোমার কথা ভাবুম না, তোমার রাস্তা দিয়া
হাঁটুম না… কেউ কইতে আইলেও তোমার নাম
কানে ঢুকতে দিমু না…

কিন্তু মনডা বেবাক বেইমান বড়ই নির্লজ্জ
সব চুক্তির নিচে হ্যায় চুপচাপ তোমার
নামটাই লেইখা রাখে।

এই শহরের মানুষজন আমারে সুখী ভাবে
তাগো কথা হুনি আর হাসি…অথচ তারা টেরও
পাইতাসে না– প্রতিদিন একটু একটু কইরা ক্যামনে
আমি নিজের মনডারে হারায়া ফেলতাসি!

রাইতে জানালা খুইলা রাখি– যদি বাতাসের লগে
তোমার কোনো খবর আইসা পড়ে!
সারারাইত অপেক্ষার পর সকালে আবার
জানালাডা বন্ধ কইরা দেই—কারণ
মনের ভিত্রে বেশিক্ষণ আশা ধইরা রাহন
যায় না, রাখলে বুকের ঘরে পচন ধরে।

এখন আর কারো লগে কথা কইতেও ইচ্ছা করে না-
নিজের ছায়ারেও মাঝে মাঝে ডর লাগে…
কখনো রাস্তার পাশে বইসা থাকি তো
কখনো অচেনা মুখগুলার দিকে চাইয়া থাকি….

আহারে… এই দুনিয়ায় সব মাইনষের ফেরার
কোনো না কোনো ঘর আছে..
খালি আমার ফিরা আসার কোনো ঠিকানা নাই!

তোমারে ভুলার লাইগা কত কিছু যে ভুইলা গেলাম…
হাসতে ভুললাম, ঘুমাইতে ভুললাম…
নিজেরে ভালোবাসতেও ভুইলা গেলাম!

শেষে বুঝলাম, পাপটা তোমারে ভালোবাসা ছিল না,
পাপটা ছিল, তোমার হৃদয়ে ঘর বানাইতে গিয়া নিজের হৃদয়ডারে খালি হাতে ফিরাইয়া আনা।

এহন কও,
যেই হৃদয় নিজের না হইয়া
অন্য কারো কাছে বন্দী হইয়া রইছে
তার মুক্তির জন্য কোন আসমানে দোয়া চাই?

Tags:

সর্বশেষ

Calendar
Mon Tue Wed Thu Fri Sat Sun
 123456
78910111213
14151617181920
21222324252627
282930  
Scroll to Top