পর্ব- ১
বাংলাদেশের অর্থনীতি নিয়ে পরিসংখ্যানের ভাষা এক কথা বলে, কিন্তু বাজারে নেমে সাধারণ মানুষের অভিজ্ঞতা আরেক কথা বলে। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, বাজেটের আকার, বৈদেশিক ঋণ, রাজস্ব আহরণ কিংবা উন্নয়ন প্রকল্প এসব নিয়ে আলোচনা যতই হোক, দিনের শেষে একজন মানুষ বাজারে গিয়ে যে বাস্তবতার মুখোমুখি হন, সেটিই তার কাছে সবচেয়ে বড় অর্থনীতি।
আজ দেশের মানুষ এমন এক সময়ে বাস করছে, যখন প্রায় প্রতিটি প্রয়োজনীয় জিনিসের দাম বেড়েছে, কিন্তু অধিকাংশ মানুষের আয় সেই হারে বাড়েনি। ফলে মূল্যস্ফীতির সবচেয়ে বড় চাপ এসে পড়েছে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারের ওপর। একসময় যে পরিবার মাস শেষে কিছু টাকা সঞ্চয় করতে পারত, আজ সেই পরিবার মাস শেষ হওয়ার আগেই হিসাব মেলাতে হিমশিম খাচ্ছে।
একটি রাষ্ট্রের উন্নয়ন কেবল বড় বড় অবকাঠামো দিয়ে পরিমাপ করা যায় না। প্রকৃত উন্নয়ন তখনই অর্থবহ হয়, যখন একজন শিক্ষক, কৃষক, শ্রমিক, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, চাকরিজীবী কিংবা রিকশাচালক তার পরিবারের জন্য প্রয়োজনীয় খাদ্য, চিকিৎসা, শিক্ষা ও বাসস্থানের ব্যয় নির্বিঘ্নে বহন করতে পারেন। যদি মানুষের সেই সক্ষমতা কমে যায়, তবে উন্নয়নের সংখ্যাগুলো সাধারণ মানুষের কাছে অর্থহীন হয়ে পড়ে।
বর্তমান বাজারে গেলে দেখা যায়, কয়েকটি মৌসুমি শাকসবজি ছাড়া অধিকাংশ সবজির দাম সাধারণ মানুষের সামর্থ্যের তুলনায় অনেক বেশি। মাছ, মাংস, ডিম, ভোজ্যতেল, মসলা কিংবা নিত্যপ্রয়োজনীয় অন্যান্য পণ্যের দামও দীর্ঘ সময় ধরে উচ্চ পর্যায়ে রয়েছে। ফলে বহু পরিবার তাদের খাদ্যতালিকা থেকে পুষ্টিকর খাবার কমিয়ে দিতে বাধ্য হচ্ছে। এটি শুধু অর্থনৈতিক সমস্যা নয়; এটি জনস্বাস্থ্য, পুষ্টি এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের সক্ষমতার সঙ্গেও গভীরভাবে সম্পর্কিত।
মূল্যস্ফীতির আরেকটি নির্মম দিক হলো এটি সবার ওপর সমান প্রভাব ফেলে না। উচ্চ আয়ের মানুষের জন্য অতিরিক্ত কয়েক হাজার টাকা ব্যয় হয়তো বড় বিষয় নয়, কিন্তু সীমিত আয়ের একটি পরিবারের জন্য সেটিই হতে পারে সন্তানের দুধ, বয়স্ক মায়ের ওষুধ কিংবা মাসের স্কুল ফি। তাই মূল্যস্ফীতি শুধু বাজারের একটি সূচক নয়; এটি মানুষের জীবনমানেরও একটি সূচক।
রাষ্ট্রের ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটের আকার প্রায় ৯.৩৮ লাখ কোটি টাকা। একই সঙ্গে বাজেট ঘাটতি পূরণে অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক ঋণের ওপর নির্ভরতা বজায় রয়েছে। পরিচালন ব্যয়ের অংশ উন্নয়ন ব্যয়ের তুলনায় বড়, আর ঋণের সুদ ও আসল পরিশোধেও উল্লেখযোগ্য অর্থ বরাদ্দ রাখতে হচ্ছে। অর্থাৎ রাষ্ট্রের আর্থিক চাপও বেড়েছে। এই বাস্তবতায় সরকারকে একদিকে রাজস্ব বাড়াতে হচ্ছে, অন্যদিকে ব্যয় নিয়ন্ত্রণের চ্যালেঞ্জও মোকাবিলা করতে হচ্ছে।
কিন্তু সাধারণ মানুষের প্রশ্ন ভিন্ন। এত বড় বাজেট, এত পরিকল্পনা, এত উন্নয়ন এসবের প্রতিফলন কি তার দৈনন্দিন জীবনে পৌঁছাচ্ছে? বাজারে গিয়ে যদি তাকে আগের তুলনায় কম জিনিস কিনতে হয়, যদি চিকিৎসা, শিক্ষা ও বাসাভাড়ার ব্যয় ক্রমাগত বাড়তে থাকে, তাহলে উন্নয়নের সুফল তিনি কোথায় অনুভব করবেন?
সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমে গেলে কেবল ব্যক্তিগত জীবন নয়, পুরো অর্থনীতিও ধীর হয়ে পড়ে। মানুষ কম কেনাকাটা করে, ক্ষুদ্র ব্যবসা ক্ষতিগ্রস্ত হয়, নতুন কর্মসংস্থান তৈরির গতি কমে যায় এবং অর্থনীতির অভ্যন্তরীণ চাহিদা দুর্বল হতে শুরু করে। ফলে মূল্যস্ফীতির বোঝা শুধু একটি পরিবারের নয়; এটি পুরো অর্থনীতির ওপর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলে।
সবকিছুর দাম বাড়ছে। বাড়ছে রাষ্ট্রের ব্যয়, বাড়ছে ঋণের বোঝা, বাড়ছে কর আদায়ের প্রয়োজন। কিন্তু যে মানুষ কর দেয়, উৎপাদন করে, শ্রম দেয় এবং অর্থনীতির চাকা সচল রাখে তার জীবন কি একই গতিতে এগোচ্ছে? নাকি কেবল জিনিসপত্রের দামই বাড়ছে, মানুষের মূল্য, মর্যাদা এবং ক্রয়ক্ষমতা আগের জায়গাতেই রয়ে গেছে?
সেখানেই আজকের বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় প্রশ্নটি দাঁড়িয়ে আছে— জিনিসপত্রের দাম বাড়ে, তবে মানুষের দাম বাড়ে না।
লেখক পরিচিতি :
সাধারণ সম্পাদক- ফরিদগঞ্জ লেখক ফোরাম,
সাংবাদিক ও সমাজকর্মী।
