১০ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ

উপ-সম্পাদকীয়

মো. মিজানুর রহমান : 

১২ রবিউল আউয়াল—পবিত্র সেই মাস, যে মাসে মহান আল্লাহ তা’আলা বিশ্ববাসীর জন্য রহমতস্বরূপ পাঠিয়েছেন আমাদের প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে। যিনি আজীবন উম্মতের হেদায়েত ও নাজাতের জন্য অশ্রু বিসর্জন করেছেন এবং আখেরাতেও শাফায়াতের জন্য ব্যাকুল থাকবেন। 

নবীজির প্রতি অগাধ ভালোবাসা এবং তাঁর দেখানো একাত্মবাদের শিক্ষার প্রেক্ষাপটে আমাদের বর্তমান সামাজিক ও ধর্মীয় পরিবেশ নিয়ে কিছু অনুভূতি শেয়ার করতে চাই।

একজন সাধারণ মুসলিম হিসেবে আমাদের দেশের ইসলামের খেদমতে নিয়োজিত বিভিন্ন ধারার কাজকে আমি অত্যন্ত শ্রদ্ধার সাথে দেখি। বিশেষ করে তিনটি ধারা আমার কাছে অত্যন্ত অর্থবহ মনে হয়।

কওমি আলেমসমাজ: সরকারি অনুদান বা সহায়তার মুখাপেক্ষী না হয়েও তারা নিজেদের জীবন, যৌবন, সময় ও অর্থ কুরবানি করে দ্বীনের ইলম রক্ষা করছেন এবং ‘দায়ী ইলাল্লাহ’ হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।

তাবলীগ জামাত: সম্পূর্ণ দুনিয়াবি স্বার্থ ছাড়া কেবল নিজের অর্থ ও সময় ব্যয় করে প্রতিটি মানুষকে দ্বীনের সঠিক পথে ডাকার এক অনন্য মেহনত। তারা কারো সমালোচনা বা রাজনৈতিক বিরোধিতায় না গিয়ে কেবল ‘দায়ী ইলাল্লাহ’ কাজ চালিয়ে যান।

আহলে হাদীস: গবেষণাধর্মী চর্চা এবং সহিহ হাদিসের প্রতি সচেতনতা বৃদ্ধির মাধ্যমে আধুনিক শিক্ষিত সমাজের মাঝে তারা ইসলামের মৌলিক বিষয়গুলো সুন্দরভাবে ছড়িয়ে দিচ্ছেন।

পাশাপাশি বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী রাজনৈতিক অঙ্গনে ইসলামের প্রতিনিধিত্বের চেষ্টা করছে, আর আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাত, পীর-মাশায়েখ ও অন্যান্য ধারাগুলোও স্ব-স্ব অবস্থান থেকে ইসলামি সংস্কৃতি ও আমলের প্রচার করছে।

বেদনার বিষয় হলো—আমার পছন্দের এই প্রধান তিন ধারা যেন আজ তিন মেরুতে অবস্থান করছে। শত্রুর বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার বদলে তারা একে অপরের প্রতি বৈরী–ভাবাপন্ন হয়ে পড়েছে। এই পরিস্থিতি আমাকে একটি বিখ্যাত গল্পের কথা মনে করিয়ে দেয়।

বনে একপাল ভেড়া সবসময় একসাথে থাকত, তাই বাঘ কখনো তাদের শিকার করতে পারত না। বাঘ চতুরতার সাথে ভেড়াদের বলল, “তোমাদের সাথে একটি চুক্তি করি—তোমাদের মধ্যে যে সবার পেছনে থাকবে, আমি শুধু তাকেই খাব।”।ভেড়ারা ভাবল, “আমি তো সামনেই থাকব, পেছনের জন যাক।”

এর পরিণতি হলো ভয়াবহ। মূল শত্রু বাঘকে ভুলে ভেড়ারা নিজেরাই নিজেদের প্রতিযোগী ও শত্রু বানিয়ে ফেলল। প্রত্যেকে সামনে যাওয়ার দৌড়ে ব্যস্ত হয়ে পড়ল, আর প্রতিদিন পেছনের কেউ না কেউ বাঘের পেটে যেতে লাগল। কিন্তু যেদিন তাদের শুভবুদ্ধির উদয় হলো, তারা একে অপরকে ছেড়ে না দিয়ে একটি বৃত্ত তৈরি করে ঘুরতে শুরু করল। বাঘ আর কাউকেই ‘পেছনে’ খুঁজে পেল না এবং সে পরাজিত হলো।

আজকে আমাদের অবস্থাও অনেকটা সেই গল্পটির মতোই। ইসলাম ও মুসলিম উম্মাহর আসল প্রতিপক্ষ বা চ্যালেঞ্জগুলোকে এড়িয়ে আমরা নিজেদের মধ্যেই বিভাজন ও প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হয়ে পড়েছি। একে অপরকে পেছনে ফেলার লড়াইয়ে চূড়ান্ত ক্ষতি হচ্ছে পুরো উম্মাহর। 

এখনই সময়—সামনে যাওয়ার অন্ধ প্রতিযোগিতা বন্ধ করে পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ, প্রজ্ঞা ও ঐক্যের ‘প্রতিরোধ বলয়’ তৈরি করার। আমাদের কর্মপদ্ধতি ও মতপার্থক্য ভিন্ন হতে পারে, কিন্তু লক্ষ্য তো এক—আল্লাহর সন্তুষ্টি এবং দ্বীনের বিজয়।

আমার আকুল আবেদন, শ্রদ্ধেয় শীর্ষ আলেম ও দায়িত্বশীলরা যেন নিজেদের মধ্যে কাদা ছোঁড়াছুঁড়ি বন্ধ করে কীভাবে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে চলা যায়, সেই পথ বের করেন। নিজেদের ভুল বোঝাবুঝি দূর করে এক ছাতার নিচে আসার কৌশল তারা নিজেরাই সবচেয়ে ভালো বুঝবেন। প্রয়োজন শুধু সদিচ্ছা ও ঐক্যের মানসিকতা। 

আল্লাহ তা’আলা আমাদের আলেমসমাজ ও মুসলিম উম্মাহকে অহেতুক বিভেদ ভুলে এক হওয়ার তৌফিক দান করুন। আমিন।

Tags:

সর্বশেষ

Calendar
Mon Tue Wed Thu Fri Sat Sun
 123456
78910111213
14151617181920
21222324252627
282930  
Scroll to Top