২৭শে জুলাই, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ

এস এম তাইয়্যেব হোসাইন :

পরিচিতি: চাঁদপুর জেলার ফরিদগঞ্জ উপজেলা ১৫টি ইউনিয়ন ও একটি পৌরসভা নিয়ে গঠিত প্রশাসনিক কাঠামো। এই উপজেলার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ইউনিয়ন হলো ১৬নং রূপসা দক্ষিণ ইউনিয়ন। চাঁদপুর-লক্ষ্মীপুর আঞ্চলিক মহাসড়ক এই ইউনিয়নের বুক চিরে চলে যাওয়ায় এ এলাকার যোগাযোগব্যবস্থা কিছুটা উন্নত। ইউনিয়নের পশ্চিমে ১১নং চরদুঃখিয়া (পূর্ব) ইউনিয়ন, দক্ষিণে ১৪নং ফরিদগঞ্জ দক্ষিণ (কালিরবাজার) ইউনিয়ন, পূর্বে ১৫নং উত্তর রূপসা ইউনিয়ন এবং উত্তরে লক্ষ্মীপুর জেলার রায়পুর উপজেলা অবস্থিত।

ইতিহাস ও ঐতিহ্য: রূপসা দক্ষিণ ইউনিয়ন ইতিহাস ও ঐতিহ্যের এক সমৃদ্ধ এলাকা। এই ইউনিয়নের সাহেবগঞ্জ গ্রামে ঔপনিবেশিক আমলে ইউরোপীয় নীলকর বণিকরা নীল চাষের কেন্দ্র বা নীলকুঠি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। স্থানীয়দের মুখে প্রচলিত রয়েছে- খ্রিস্টান দুইজন ব্যবসায়ী জমিদার এ অঞ্চলে ব্যবসাবাণিজ্য, যোগাযোগব্যবস্থা ও বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। তারা এখানে বসবাস শুরু করেন এবং বর্তমানে তাদের উত্তরসূরি সাহেবগঞ্জ গ্রামে বসবাস করছেন।

বর্তমানে ইউনিয়নে মুসলিম, হিন্দু ও খ্রিস্টান সম্প্রদায়ের মানুষ সম্প্রীতির সঙ্গে বসবাস করছেন। বিশেষ করে সাহেবগঞ্জ গ্রামে খ্রিস্টান সম্প্রদায়ের বসতি ও ঐতিহাসিক গির্জা এ অঞ্চলের ধর্মীয় বৈচিত্র্যের অনন্য নিদর্শন।

প্রশাসনিক কাঠামো: রূপসা দক্ষিণ ইউনিয়নের মোট আয়তন ১১.৫৭ বর্গকিলোমিটার বা ২,৮৫৮ একর। ইউনিয়নে ৯টি মৌজা ও ৯টি গ্রাম রয়েছে। এখানে একটি ইউনিয়ন পরিষদ কমপ্লেক্স, ১টি স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্র, ২টি কমিউনিটি ক্লিনিক, ১টি ভূমি অফিস, ১টি কৃষি সম্প্রসারণ অফিস এবং কয়েকটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় রয়েছে।

ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচিত জনপ্রতিনিধির মধ্যে রয়েছেন ১ জন চেয়ারম্যান, ৯ জন সাধারণ সদস্য এবং ৩ জন সংরক্ষিত মহিলা সদস্য। এছাড়া ১ জন সচিব, ১ জন হিসাব সহকারী কাম কম্পিউটার অপারেটর, ১ জন দফাদার এবং ৯ জন মহল্লাদার (চৌকিদার) দায়িত্ব পালন করছেন। ইউনিয়নে ১০ জন গ্রামপুলিশ কর্মরত আছেন। বর্তমান ইউনিয়ন পরিষদ ভবন ১ জানুয়ারি ২০০৪ সালে স্থাপিত হয়।

গ্রাম ও ওয়ার্ড বিন্যাস: রূপসা দক্ষিণ ইউনিয়ন ৯টি ওয়ার্ড নিয়ে গঠিত। প্রথম ওয়ার্ডে নলগোড়া ও রঘুনাথপুর, দ্বিতীয় ওয়ার্ডে কাওনিয়া, তৃতীয় ওয়ার্ডে কাওনিয়া ও মান্দারখীল, চতুর্থ ওয়ার্ডে চরমান্দারী ও গৃদকালিন্দিয়া, পঞ্চম ওয়ার্ডে চরমান্দারী, চরপক্ষিয়া ও পক্ষিয়াচর, ষষ্ঠ ওয়ার্ডে উত্তর সাহেবগঞ্জ ও গৃদকালিন্দিয়া, সপ্তম ওয়ার্ডে চরমুঘুয়া ও উত্তর সাহেবগঞ্জ, অষ্টম ওয়ার্ডে মধ্য সাহেবগঞ্জ এবং নবম ওয়ার্ডে দক্ষিণ সাহেবগঞ্জ গ্রাম অন্তর্ভুক্ত।

যোগাযোগ ও অবকাঠামো: ফরিদগঞ্জ উপজেলা সদর থেকে ১৬নং রূপসা দক্ষিণ ইউনিয়ন পরিষদ (গৃদকালিন্দিয়া বাজার) সড়কপথে প্রায় ৪.৪ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত।

এই ইউনিয়ন দিয়ে চাঁদপুর-লক্ষ্মীপুর আঞ্চলিক মহাসড়ক হ‌ওয়ার কারণে ইউনিয়নের যোগাযোগব্যবস্থা অত্যন্ত সহজ। উপজেলা সদরের সঙ্গে বাস, সিএনজি ও অটোরিকশায় যোগাযোগ করা যায়। অভ্যন্তরীণ যাতায়াতে অটোরিকশা ও রিকশা ব্যবহৃত হয়।

ইউনিয়নে ৬ কিলোমিটার আর অ্যান্ড এইচ সড়ক, ২৮ কিলোমিটার এলজিইডি পাকা সড়ক, ৩০ কিলোমিটার কাঁচা রাস্তা, ৩০টি পাকা সেতু, ১০০টি কালভার্ট এবং ৩০০টি গভীর নলকূপ রয়েছে। এছাড়া ১২৫টি বড় ও ২৩৩টি ছোট পুকুর রয়েছে।

জনসংখ্যা ও ভোটার: ইউনিয়নের মোট জনসংখ্যা প্রায় ৩৭ হাজার। এরমধ্যে পুরুষ ১৭ হাজার ৫০০ জন এবং মহিলা ১১ হাজার ৫০০ জন বলে স্থানীয় প্রশাসনিক তথ্যসূত্রে উল্লেখ রয়েছে। ২৮ নভেম্বর ২০২০ সালের হালনাগাদ তথ্য অনুযায়ী ইউনিয়নের মোট ভোটার সংখ্যা ২৪ হাজার ৪৫৪ জন। এর মধ্যে পুরুষ ভোটার ১২ হাজার ৩৩০ জন এবং মহিলা ভোটার ১২ হাজার ১১৪ জন। একই সময়ে নিবন্ধিত প্রবাসীর সংখ্যা ছিল ৯৮১ জন।

নদী, খাল ও ঝিল: ডাকাতিয়া নদী মূলত রূপসা দক্ষিণ ইউনিয়নের উত্তর ও উত্তর-পূর্ব সীমান্ত ঘেঁষে নলগোড়া, রঘুনাথপুর ও কাউনিয়া গ্রামের উত্তর দিক দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে। গৃদকালিন্দিয়া বাজার থেকে উত্তর বা উত্তর-পূর্ব দিকে মাত্র ২ থেকে ৩ কিলোমিটার সামনে গেলেই ডাকাতিয়া নদীতে পৌঁছানো যায়।

ইউনিয়নের উত্তর সীমান্ত দিয়ে প্রবাহিত ডাকাতিয়া নদী থেকে কয়েকটি সংযোগ খাল ভেতরের দিকে এবং পার্শ্ববর্তী রামগঞ্জ ও রায়পুর উপজেলার দিকে প্রবেশ করেছে।

গৃদকালিন্দিয়া বাজার এবং সাহেবগঞ্জ নীলকুঠির আশপাশে গুপ্তের বিলের পাশ দিয়ে পানি নিষ্কাশনের জন্য খাল রয়েছে, যা ডাকাতিয়া নদীর সঙ্গে মিলিত হয়েছে। ডাকাতিয়া নদী ও খাল ঝিলের কারণে এ এলাকায় সহজে পানি পাওয়া যায়। ফলে ধান চাষ তুলনামূলকভাবে ভালো হয়। তবে খরা মৌসুমে খাল ও বিলে পানি কমে যাওয়ায় কৃষিকাজ ও চাষাবাদ কমে যায়।

শিক্ষাঙ্গন: শিক্ষাক্ষেত্রে রূপসা দক্ষিণ ইউনিয়ন সমৃদ্ধ। এখানে একটি ডিগ্রি কলেজ (বর্তমানে অনার্স কলেজ), চারটি বালক উচ্চ বিদ্যালয়, দুটি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়, দুটি সিনিয়র মাদ্রাসা, পাঁচটি নূরানী মাদ্রাসা, ১৪টি ফোরকানিয়া মাদ্রাসা, চারটি হাফিজিয়া মাদ্রাসা, চারটি মহিলা মাদ্রাসা, দুটি এতিমখানা, ছয়টি কিন্ডারগার্টেন, নয়টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় এবং একটি বেসরকারি নিবন্ধিত প্রাথমিক বিদ্যালয় রয়েছে। উল্লেখযোগ্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের মধ্যে রয়েছে গৃদকালিন্দিয়া হাজেরা হাসমত ডিগ্রি কলেজ, গৃদকালিন্দিয়া উচ্চ বিদ্যালয়, পূর্ব কাউনিয়া ওয়াই এম উচ্চ বিদ্যালয় এবং সাহেবগঞ্জ উচ্চ বিদ্যালয়। ইউনিয়নের গড় শিক্ষার হার ৬১ শতাংশ।

রাজনৈতিক অবদান: ফরিদগঞ্জ উপজেলার এই ইউনিয়ন থেকে জাতীয় সংসদে প্রতিনিধিত্ব করেছেন ইউনিয়নের দুই কৃতি সন্তান সাবেক সংসদ সদস্য লায়ন হারুনুর রশিদ এবং মরহুম ড. মোহাম্মদ শামছুল হক ভূঁইয়া। তাঁদের রাজনৈতিক অবদান আজও এলাকাবাসীর কাছে স্মরণীয়।

ধর্মীয় সম্প্রীতি: ধর্মীয় সম্প্রীতির উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত রূপসা দক্ষিণ ইউনিয়ন। এখানে রয়েছে প্রায় ৫০টি জামে মসজিদ, একটি ঐতিহাসিক খ্রিস্টান গির্জা এবং একটি বেসরকারি খ্রিস্টান ধর্মালয়।

অর্থনীতি ও কৃষি: রূপসা দক্ষিণ ইউনিয়নের অর্থনীতির প্রধান ভিত্তি কৃষি। এখানকার প্রধান ফসল ধান। ধান কাটার পর মৌসুমি ফসল হিসেবে মাসকলাই ডাল চাষ করা হয়। খালের পাড় ও উর্বর জমিতে তরমুজ, বাঙ্গি, লাউ, কুমড়াসহ বিভিন্ন শীতকালীন ও গ্রীষ্মকালীন সবজি উৎপাদিত হয়। বসতবাড়ির আঙিনায় সুগন্ধি লেবু, পেয়ারাসহ বিভিন্ন ফলের গাছ রয়েছে। ইউনিয়নের সুপারি বাগানও বিশেষভাবে পরিচিত। খাল, বিল ও ঝিলসমৃদ্ধ হওয়ায় মাছ চাষ হয় এই ইউনিয়নে।

মোট জমির পরিমাণ ২ হাজার ৯৩৮ দশমিক ১২ একর। এরমধ্যে কৃষিজমি ২ হাজার ৪৩৪ দশমিক ৯৪ একর, অকৃষিজমি ৪১০ দশমিক ৬৫ একর এবং খাসজমি ৯২ দশমিক ৫৩ একর। 

বাজার ও বাণিজ্য: ইউনিয়নে চারটি গুরুত্বপূর্ণ হাট-বাজার রয়েছে। গৃদকালিন্দিয়া বাজার প্রতি রবিবার ও বৃহস্পতিবার বসে, যেখানে কাঁচা বাজার, মাছ, মাংস, শাকসবজি ও কোরবানির পশু বিক্রি হয়। বর্ডার মৌলভী বাজার প্রতি শনিবার ও মঙ্গলবার বসে। কুঠির বাজার প্রতি রবিবার ও বুধবার এবং চৌহমুনী বাজার প্রতি সোমবার ও বৃহস্পতিবার অনুষ্ঠিত হয়। এসব বাজার স্থানীয় অর্থনীতির প্রাণকেন্দ্র হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে।

স্বাস্থ্য ও সামাজিক সুরক্ষা: স্বাস্থ্যসেবার জন্য ইউনিয়নে একটি স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্র এবং দুটি কমিউনিটি ক্লিনিক রয়েছে। শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও ক্ষুদ্রঋণ কার্যক্রমে আশা, গ্রামীণ ব্যাংক, সিসিডিএ, পিপিই ও শুকরনী সমিতিসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান কাজ করছে। ২০১৯-২০২০ অর্থবছরে ইউনিয়নের ২৬ জন প্রতিবন্ধী ভাতা পেয়েছেন এবং ৫৩৩ জন হতদরিদ্র ব্যক্তি সরকারি সহায়তার আওতায় ছিলেন।

দর্শনীয় স্থান: রূপসা দক্ষিণ ইউনিয়নের উল্লেখযোগ্য ঐতিহাসিক ও দর্শনীয় স্থানের মধ্যে রয়েছে সাহেবগঞ্জ নীলকুঠি, জালালের দিঘি, জৈনপুরের হুজুরের মসজিদ, দক্ষিণ সাহেবগঞ্জ পুরাতন মসজিদ এবং সাহেবগঞ্জ খ্রিস্টান গির্জা। এসব স্থান ইতিহাস ও সংস্কৃতির গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষ্য বহন করছে।

প্রখ্যাত ব্যক্তিত্ব: রূপসা দক্ষিণ ইউনিয়নের কৃতি সন্তানদের মধ্যে রয়েছেন সাবেক সংসদ সদস্য মরহুম ড. মোহাম্মদ শামছুল হক ভূঁইয়া, সাবেক সংসদ সদস্য লায়ন হারুনুর রশিদ, বীর মুক্তিযোদ্ধা মরহুম মৌলভী আইয়ুব আলী খান (সাবেক চেয়ারম্যান), মরহুম আব্দুল মতিন খান (সাবেক চেয়ারম্যান), বীর মুক্তিযোদ্ধা মরহুম মাওলানা মুসলিম (সাবেক চেয়ারম্যান), মরহুম নুর মোহাম্মদ ভূঁইয়া, মরহুম আলহাজ লুৎফুর রহমান খন্দকার, মরহুম ইউনুছ মিয়া পণ্ডিত, মরহুম ডাক্তার আলী আজগর, মো. ইসমাইল ম্যানেজার এবং রফিক উল্লাহ চৌধুরী প্রমুখ।

রূপসা দক্ষিণ ইউনিয়নটি বাংলাদেশের জাতীয় গণমাধ্যমে একটি বিশেষ কারণে নির্বাচনকালীন সময়ে আলোচিত। এখানে ধর্মীয় বিশ্বাস ও সামাজিক প্রথার কারণে দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে (টানা ৫৪ বছরেরও বেশি) স্থানীয় নারীরা ভোটকেন্দ্রে গিয়ে ভোট দেন না। এটি এই এলাকার একটি দীর্ঘদিনের প্রথা সামাজিক বৈশিষ্ট্য। যার ফলে নির্বাচন আসলেই এখানে সাংবাদিক গণমাধ্যমকর্মীরা এই ইউনিয়নের গ্রাম নিয়ে নিউজ প্রচার করার ফলে আলোচিত হয়ে আছে সারা বাংলাদেশে।

ফরিদগঞ্জ উপজেলার আয়তনের দিক দিয়ে দশম অবস্থান করছে এই ইউনিয়ন। ইতিহাসের গৌরব, উন্নয়নের ধারাবাহিকতা এবং মানুষের আন্তরিক সহাবস্থানের কারণে ইউনিয়নটি আজও ধর্মীয় সম্প্রীতি বজায় রাখছে।

তথ্য সূত্র: বাংলাদেশ জাতীয় তথ্য বাতায়ন ও বাংলা উইকিপিডিয়া।

Tags:

সর্বশেষ

Calendar
Mon Tue Wed Thu Fri Sat Sun
 12345
6789101112
13141516171819
20212223242526
2728293031  
Scroll to Top