২৭শে জুলাই, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ

এমতেয়াজ পাটওয়ারী ফরহাদ :  

ইলিশের বাড়ি চাঁদপুরের ফরিদগঞ্জ উপজেলার ঐতিহ্যবাহী রূপসা বাজারের প্রাণকেন্দ্রে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে ইতিহাস, ঐতিহ্য ও ধর্মীয় স্থাপত্যের এক অনন্য নিদর্শন ‘রূপসা জমিদারবাড়ি জামে মসজিদ’। স্থানীয়দের কাছে ‘মসজিদে নূর’ নামে পরিচিত এই প্রাচীন স্থাপনাটি শুধু একটি উপাসনালয় নয়, বরং প্রায় দুই শতাব্দী ধরে এ অঞ্চলের ধর্মীয়, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের ধারক ও বাহক।

১২৮৪ বঙ্গাব্দে বৃহত্তর মেঘনাপাড়ের প্রভাবশালী জমিদার মোহাম্মদ গাজী চৌধুরী আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন এবং স্থানীয় মুসল্লিদের ইবাদতের সুবিধার্থে মসজিদটি নির্মাণ করেন। সে সময় প্রায় ২০ হাজার টাকা ব্যয়ে নির্মিত এ স্থাপনাটি আজও তার নান্দনিকতা ও ঐতিহাসিক মর্যাদা অক্ষুণ্ন রেখে টিকে আছে। মসজিদের প্রবেশপথে শ্বেতপাথরে ফার্সি ভাষায় খোদাই করা শিলালিপি নির্মাণ ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষ্য বহন করছে।

মসজিদের মূল ভবনের দৈর্ঘ্য ৪৭ ফুট এবং প্রস্থ ৪০ ফুট। সামনে রয়েছে ৫৩ ফুট বাই ৩০ ফুট আয়তনের দেয়ালবেষ্টিত প্রশস্ত চত্বর। মূল স্থাপনার সামনের অংশে তিনটি বড় গম্বুজসহ পুরো মসজিদে ছোট-বড় মিলিয়ে মোট ৩৯টি গম্বুজ রয়েছে। মার্বেল পাথরের সূক্ষ্ম কারুকাজ, খিলানের নান্দনিক নকশা এবং সুষম স্থাপত্যশৈলী ইসলামি শিল্প-ঐতিহ্যের এক অনন্য উদাহরণ হিসেবে দর্শনার্থীদের মুগ্ধ করে। মসজিদের পশ্চিম পাশে রয়েছে শানবাঁধানো ঘাটসংবলিত একটি বৃহৎ দিঘি। স্থানীয় মুসল্লিরা এখনও সেই দিঘির পানিতে অজু করেন। দিঘির শান্ত পরিবেশ, পাখির কলকাকলি এবং আজানের ধ্বনি মিলিয়ে পুরো এলাকা এক অপার্থিব প্রশান্তির আবহ সৃষ্টি করে।

সময়ের প্রয়োজন বিবেচনায় মূল স্থাপনার ঐতিহ্য অক্ষুণ্ন রেখে তিন দফায় মসজিদের সম্প্রসারণ করা হয়েছে। বর্তমানে একসঙ্গে প্রায় ৫০০ জন মুসল্লি এখানে নামাজ আদায় করতে পারেন। বিশেষ করে পবিত্র রমজান মাসে তারাবির নামাজের সময় মসজিদ প্রাঙ্গণ মুসল্লিদের উপস্থিতিতে পরিপূর্ণ হয়ে ওঠে।

মসজিদের খতিব মাওলানা মো. আবদুর রহমান বলেন, “এই মসজিদ শুধু ইবাদতের স্থান নয়, এটি আমাদের আধ্যাত্মিক ঐতিহ্যের কেন্দ্র। এখানে দাঁড়ালে মনে হয় পূর্বপুরুষদের দোয়া ও ইতিহাসের সঙ্গে আমাদের এক গভীর সংযোগ তৈরি হয়।”

স্থানীয় বাসিন্দা শামীম হোসেন বলেন, “রূপসা বাজারের পরিচয়ের সঙ্গে এই মসজিদের নাম ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে। বাইরে থেকে কেউ এলে আমরা গর্বের সঙ্গে এই ঐতিহাসিক স্থাপনাটি দেখাই। এটি আমাদের বিশ্বাস, ঐতিহ্য ও ইতিহাসের প্রতীক।”

জমিদার পরিবারের উত্তরসূরি এবং ‘মোহাম্মদ গাজী চৌধুরী ফাউন্ডেশন’-এর প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি মেহেদী হাসান চৌধুরী বলেন, “আমাদের পূর্বপুরুষ যে মহৎ উদ্দেশ্যে এই মসজিদ নির্মাণ করেছিলেন, সেই ঐতিহ্য ও আমানত সংরক্ষণ করাই আমাদের দায়িত্ব। মূল স্থাপত্যের বৈশিষ্ট্য অক্ষুণ্ন রেখে আধুনিক সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করার মাধ্যমে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে এই ঐতিহ্য তুলে ধরতে আমরা কাজ করে যাচ্ছি।”

প্রায় দুই শতাব্দীর ইতিহাস বুকে ধারণ করে দাঁড়িয়ে থাকা রূপসা জমিদারবাড়ি জামে মসজিদ আজও চাঁদপুরের অন্যতম ঐতিহাসিক ও ধর্মীয় স্থাপনা হিসেবে সমানভাবে আকর্ষণ সৃষ্টি করছে। ইতিহাস, স্থাপত্য ও আধ্যাত্মিক ঐতিহ্যের অনন্য সমন্বয়ে এটি শুধু ফরিদগঞ্জ নয়, সমগ্র চাঁদপুরের গৌরবের এক উজ্জ্বল প্রতীক।

ফরিদগঞ্জ টাইমস/কেএম

Tags:

সর্বশেষ

Calendar
Mon Tue Wed Thu Fri Sat Sun
 12345
6789101112
13141516171819
20212223242526
2728293031  
Scroll to Top