টিটু হোসেন :
দুই দিনের টানা বৃষ্টি। আকাশজুড়ে মেঘ, চারপাশে টুপটাপ বৃষ্টির শব্দ। বৃষ্টির পানি নেমে এসে আবারও প্রাণ ফিরিয়েছে ফরিদগঞ্জের খাল-বিল ও জলাশয়ে। কোথাও পানির উচ্চতা বেড়েছে, কোথাও সৃষ্টি হয়েছে নতুন স্রোত। আর সেই স্রোতের সঙ্গে যেন জেগে উঠেছে গ্রামবাংলার চিরচেনা এক দৃশ্য—খালে পাতা বিশাল বেয়াল জাল।
ফরিদগঞ্জ পৌরসভার ৩নং ওয়ার্ডের ভাটিরগাঁও এলাকার একটি খালের পাড়ে দাঁড়ালেই চোখে পড়ে সেই দৃশ্য। খালের পানিতে বাঁশের কাঠামো, তার সঙ্গে পাতা বড় আকৃতির ভেসাল জাল। জেলেরা অপেক্ষায় থাকেন কখন জালে টান পড়বে। কিছুক্ষণ পর জাল তুলে আনতেই দেখা মেলে ছোট-বড় নানা দেশীয় মাছের।
এই দৃশ্য শুধু মাছ ধরার দৃশ্য নয়; এর সঙ্গে মিশে আছে বর্ষার গ্রামীণ জীবনের এক টুকরো আবেগ।
বৃষ্টির সঙ্গে খালের পানির সম্পর্ক যেন বহু পুরোনো। শুকনো মৌসুমে যে খাল অনেকটাই শান্ত, কোথাও কোথাও অগভীর কিংবা পানিশূন্য হয়ে পড়ে, বর্ষা এলেই তার চেহারা বদলে যায়। পানি বাড়ে, স্রোত তৈরি হয়, আর সেই স্রোতের সঙ্গে চলাচল শুরু করে নানা প্রজাতির দেশীয় মাছ।
স্থানীয় জেলেদের কাছে এ সময়টা তাই কিছুটা আশারও। উপযুক্ত জায়গায় ভেসাল জাল পেতে অপেক্ষা করলে জালে উঠে আসে শোল, টাকি, কৈ, পুঁটি, শিংসহ নানা ধরনের মাছ। মাছের পরিমাণ প্রতিদিন একরকম না হলেও বৃষ্টির পর খালে মাছের চলাচল বাড়লে জেলেদের মুখে হাসি ফোটে।
তবে এই হাসির পেছনে রয়েছে পরিশ্রমও। পানির গভীরতা ও স্রোত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে মাছ ধরার ঝুঁকিও বাড়ে। তারপরও জীবিকার তাগিদে জেলেরা নেমে পড়েন পানিতে কিংবা খালের পাড়ে বসে অপেক্ষা করেন জালের টানের।
ভাটিরগাঁওয়ের এই খাল কেবল মাছ ধরার জায়গা নয়। বর্ষাকালে এটি আশপাশের এলাকার পানি নিষ্কাশনেরও একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। খালটি পানিতে ভরে উঠলে দুই পাড়ের সবুজ প্রকৃতি আর পানির ওপর ভেসে থাকা বিশাল ভেসাল জাল মিলিয়ে তৈরি হয় এক অপূর্ব গ্রামীণ দৃশ্য।
শহর ও আধুনিক জীবনের ব্যস্ততায় এমন দৃশ্য হয়তো অনেকের চোখেই ধরা পড়ে না। অথচ এই খাল, এই জাল, এই মাছ আর জেলেদের ব্যস্ততা—সব মিলিয়েই তো বাংলার বর্ষা।
একসময় খাল-বিলের দেশীয় মাছ ছিল গ্রামীণ মানুষের নিত্যদিনের খাবারের অন্যতম উৎস। বর্ষা এলেই বাড়ির পাশের খাল কিংবা বিল থেকে মাছ ধরে আনার স্মৃতি অনেকের শৈশবের সঙ্গে জড়িয়ে আছে। সময় বদলেছে, জলাশয় কমেছে, খাল দখল ও দূষণের কারণে অনেক জায়গায় মাছের স্বাভাবিক বিচরণও বাধাগ্রস্ত হয়েছে। তবু বর্ষার পানিতে যখন আবার খাল ভরে ওঠে, তখন সেই পুরোনো দিনের কিছুটা যেন ফিরে আসে।
তবে এই প্রাণচাঞ্চল্য টিকিয়ে রাখার দায়িত্বও আমাদের। মাছের প্রজনন মৌসুমে নির্বিচারে মাছ শিকার, নিষিদ্ধ জাল ব্যবহার কিংবা অবৈধ পদ্ধতিতে মাছ ধরা বন্ধ করতে হবে। একই সঙ্গে খালগুলো দখল ও দূষণমুক্ত রেখে পানির স্বাভাবিক প্রবাহ নিশ্চিত করা জরুরি।
কারণ একটি খাল শুধু পানি বহন করে না। সে বহন করে জীববৈচিত্র্য, মানুষের জীবিকা, গ্রামের অর্থনীতি আর প্রজন্মের পর প্রজন্মের স্মৃতি।
