জাতিসংঘের চোখে জুলাই: ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং প্রতিবেদন
মো. আবদুল বাতেন
২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলন দমন করতে শেখ হাসিনার সরকার এদেশে পরিকল্পিতভাবে বিচারবহির্ভূত শত শত হত্যাকাণ্ড, হাজার হাজার বিক্ষোভকারীকে গুরুতর আহত করা এবং গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের সাথে জড়িত ছিল। শেখ হাসিনার সরকার ও তার নিরাপত্তা বাহিনী এবং গোয়েন্দা সংস্থাগুলো আওয়ামী লীগের সাথে সংশ্লিষ্ট হত্যা, ধর্ষণ, খুন-গুম, গ্রেপ্তার, আটক, নির্যাতন, শিশুহত্যা, লুটতরাজ ও অন্যান্য নানাবিধ অপরাধের সাথে জড়িত ছিল। সেই প্রেক্ষিতে জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক হাইকমিশনারের কার্যালয় (ওএইচসিএইচআর) বাংলাদেশে ২০২৪ সালের ১ জুলাই থেকে ৫ আগস্টের মধ্যে সংঘটিত মানবাধিকার লঙ্ঘন ও নির্যাতনের অভিযোগে একটি স্বাধীন তদন্ত পরিচালনা করে, যাকে বলা হয় জাতিসংঘের ‘ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং প্রতিবেদন’।
জাতিসংঘের মানবাধিকার কমিশন যে কারণে উক্ত ঘটনাকে (২৪-এর জুলাই আন্দোলন দমন) আন্তর্জাতিক মানবাধিকার লঙ্ঘন বলছে, তা হলো—
১. বিক্ষোভ ও ভিন্নমত দমনের কৌশল হিসেবে রাজনৈতিক নেতা ও নিরাপত্তা বাহিনীর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা সজ্ঞানে সমন্বয়ের মাধ্যমে ও নির্দেশনায় এইসব মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা ঘটান।
২. ২০২৪ সালের ৫ জুন সরকারি চাকরিতে ৩০% মুক্তিযোদ্ধাদের বংশধরদের জন্য রেখে হাইকোর্ট রায় দিলে বিক্ষোভের সূত্রপাত হয় এবং জনগণের মধ্যে গভীর অসন্তোষের মূলে ছিল সীমাহীন দুর্নীতি, লুটপাট, দলীয়করণ, ধ্বংসাত্মক শাসনব্যবস্থা ও ভিন্নমত দমনের নানা রাজনীতি।
৩. জনগণের সমস্যা সমাধান করতে সরকার চরমভাবে ব্যর্থ হয়েছিল; সাথে দেখা দিয়েছিল চরম বৈষম্য, পাচার, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অধিকার হরণের নানা উপায়-উপকরণ।
৪. শেখ হাসিনার সরকারের প্রতি অনাস্থা জানিয়ে পেশাদার ও ধর্মীয় পটভূমি থেকে হাজার হাজার নাগরিক, নারী ও শিশুসহ সবাই অর্থপূর্ণ সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক সংস্কারের আহ্বান জানিয়ে বিক্ষোভ করেন। জনগণের ক্রমবর্ধমান ক্ষোভ দমন করা এবং ক্ষমতা আঁকড়ে থাকার প্রচেষ্টায় সরকার সহিংস উপায় অবলম্বন করে পদ্ধতিগতভাবে বিক্ষোভ দমন করার চেষ্টা করে।
৫. জুলাইয়ের মাঝামাঝি সময়ে শেখ হাসিনার সরকার ও আওয়ামী লীগ অতিরিক্ত সশস্ত্র কর্মীদের একত্রিত করে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস ও তার আশেপাশে শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভকারী শিক্ষার্থীদের ওপর ভোঁতা, ধারালো ও আগ্নেয়াস্ত্র দিয়ে হামলা চালায়। এসময় সারাদেশে যেখানেই বিক্ষোভ হয়েছে, সেখানেই ছাত্রলীগ হামলা চালিয়েছে।
৬. শিক্ষার্থীরা বেশিরভাগ সময় আত্মরক্ষা করেছে; এর প্রতিক্রিয়া হিসেবে সরকারের পুলিশ বাহিনী আরও সহিংসতার আশ্রয় নেয়। ১৭ জুলাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের একটি বড় শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভে পুলিশ ও ছাত্রলীগ হামলা চালায়, যা ছিল আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন।
৭. এইসব ঘটনার পর বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি), বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী ও আন্দোলনকারী ছাত্র-জনতা ‘কমপ্লিট শাটডাউন’ কর্মসূচি দেয়; এর প্রতিক্রিয়ায় শেখ হাসিনার সরকার সহিংসতা আরও বাড়িয়ে দেয়, ফলে স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত হতে থাকে।
৮. র্যাব ও পুলিশ বাহিনী হেলিকপ্টার থেকে গুলি ও গ্রেনেড ছুঁড়েছে; বিজিবি সামরিক রাইফেল ও শর্টগান ব্যবহার করেছে। সরকারের নিরাপত্তা বাহিনীকে প্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহারের অনুমতি দেওয়া হয়; ১৯ জুলাই রংপুরে ছাত্র আবু সাঈদকে কাছ থেকে গুলি করে হত্যা করা হয়। সেদিন সারাদেশে ব্যাপক হতাহতের ঘটনা ঘটে; নিরাপত্তা বাহিনী বিক্ষোভকারীদের খুব কাছ থেকে গুলি করে সংক্ষিপ্ত মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করে।
৯. কিছু ক্ষেত্রে সেনাবাহিনী বিক্ষোভকারীদের ওপর গুলি চালায়, আবার মাঠে থাকা জুনিয়র অফিসাররা ক্রমাগত আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহারের আদেশ প্রত্যাখ্যান করেন।
১০. জুলাইয়ের শেষের দিকে ও আগস্টের ৫ তারিখে বিক্ষোভকারীদের ঢাকামুখী পদযাত্রা ঠেকাতে সেনাবাহিনী, বিজিবি এবং পুলিশকে ব্যবহার করে একটি সরকারি পরিকল্পনা করা হয়; এতে প্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহার করতে বলা হয়। পুলিশ গুলি করলেও সেনাবাহিনী এবং কিছু জায়গায় বিজিবি বেশিরভাগ ক্ষেত্রে দাঁড়িয়ে ছিল। পুলিশের সেদিনের ভূমিকা ছিল সুস্পষ্ট মানবাধিকার লঙ্ঘন।
১১. বিক্ষোভ দমনে সরকারের যে সকল বাহিনী জড়িত ছিল, তারা হলো—পুলিশ, সশস্ত্র বাহিনীর গোয়েন্দা অধিদপ্তর (ডিজিএফআই), জাতীয় নিরাপত্তা গোয়েন্দা সংস্থা (এনএসআই), টেলিযোগাযোগ পর্যবেক্ষণ কেন্দ্র (এনটিএমসি), পুলিশের গোয়েন্দা শাখা (ডিবি), বিশেষ শাখা এবং সন্ত্রাসবাদ ও আন্তঃদেশীয় অপরাধ দমন ইউনিট (সিটিটিসি)। এ সকল সংস্থা সরাসরি সহিংস উপায়ে বিক্ষোভ দমনের কাজ করেছে, যা ছিল চরম মানবাধিকার লঙ্ঘন।
১২. এই সকল সরকারি সংস্থা নাগরিকদের গোপন নথি প্রকাশ করেছে এবং গণগ্রেপ্তার, আটক, নির্যাতন, আটককৃতদের কাছ থেকে অর্থ আদায়, স্বীকারোক্তি আদায়ে নির্বিচারে অত্যাচার, পরিবারের সদস্যদের এনে তাদেরকে আঘাত, যৌন হয়রানি, মানসিক ও শারীরিক অত্যাচারসহ নানাবিধ উপায়ে নির্যাতন করেছে।
১৩. সিটিটিসিতে শিশুদের আটক, পুলিশের গোয়েন্দা শাখা মিন্টো রোডে এবং ডিজিএফআই দ্বারা ছাত্র নেতাদের অপহরণ ও নির্যাতন এবং বিক্ষোভ কর্মসূচি প্রত্যাহারে বাধ্য করার চেষ্টা, ডিজিএফআই, এনএসআই ও ডিবি শাখার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা পরিকল্পিতভাবে জীবনরক্ষাকারী চিকিৎসা সেবায় বাধা প্রদান, চিকিৎসক ও নার্সদের ভয় দেখানো, মৃত্যুর তথ্য সরিয়ে ফেলা, লাশ নিয়ে যাওয়া, হাসপাতাল থেকে গ্রেপ্তার ও নির্যাতন ইত্যাদি ছিল সুস্পষ্ট ও চরম মানবাধিকার লঙ্ঘন।
১৪. গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের নথি গোপন করার জন্য সরকার মন্ত্রিপর্যায় ও গোয়েন্দা সংস্থাগুলো একত্রে কাজ করেছে। ইন্টারনেট সেবা বন্ধ করা এবং একই সঙ্গে ডিজিএফআই, এনএসআই ও র্যাব ক্রমাগত গণমাধ্যমগুলোকে আন্দোলন দমনের খবর, তথ্য, ছবি ও ভিডিও প্রচার না করতে বাধ্য করেছে। সেই সাথে বিক্ষোভকারীদের সন্ত্রাসী ও জঙ্গি বানানোর প্রতিবেদন সংবাদে প্রচারে বাধ্য করা হয়েছিল। ভুক্তভোগী পরিবার ও আইনজীবীদের মুখ বন্ধ রাখতে ভয়ভীতি প্রদর্শনের কাজে সরাসরি ডিজিএফআই ও পুলিশ পরিকল্পিতভাবে জড়িত ছিল।
১৫. একই সময় আওয়ামী লীগ, ছাত্রলীগ, যুবলীগ ও পুলিশ রাজনৈতিক ভিন্নমতের (বিএনপি ও জামায়াত) হাজার হাজার নেতা-কর্মীর বাড়িতে হামলা করেছে। বিক্ষোভের সময় পুলিশ ও আওয়ামী লীগ পরিকল্পিতভাবে চট্টগ্রামে আদিবাসী, হিন্দু সম্প্রদায় ও আহমদীয় মুসলিম সংখ্যালঘু সদস্যদের ওপর হামলা চালায় এবং বাড়িঘর ও উপাসনালয় পুড়িয়ে দেয়।
১৬. ধর্মীয় ও জাতিগত বৈষম্য তৈরি করে নির্যাতন চালিয়ে মিডিয়াকে বাধ্য করা হয়েছে এর দায় ভিন্নমতের ওপর চাপিয়ে দিতে, যেন সব দায় বিএনপি ও জামায়াতের ওপর পড়ে। তবে ওএইচসিএইচআর গভীর নিরীক্ষা ও ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর সাথে কথা বলে এই তথ্য নিশ্চিত করেছে যে, সংশ্লিষ্ট ঘটনাগুলোতে বিএনপি ও জামায়াতের জাতীয় নেতৃত্ব কিংবা সাধারণ কোনো সদস্য জড়িত ছিল না; বরং তারা সংখ্যালঘু গোষ্ঠীগুলোর পাশে দাঁড়িয়েছে, সহযোগিতা করেছে এবং সংঘটিত ঘটনার নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছে।
১৭. সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের প্রত্যক্ষ সাক্ষ্য এবং অন্যান্য অভ্যন্তরীণ সূত্রের ভিত্তিতে ওএইচসিএইচআর এটি প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হয়েছে যে—রাজনৈতিক নেতৃত্বে সজ্ঞানে, সমন্বিতভাবে ও নির্দেশনায় এই গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘন ও নির্যাতনগুলো পুলিশ, আধা-সামরিক, সামরিক ও সকল গোয়েন্দা সংস্থা এবং আওয়ামী লীগের কাজের সমন্বয়ের মাধ্যমে সমান্তরালে কাজ করেছে।
১৮. উভয় পক্ষ একাধিক সূত্র থেকে মাঠপর্যায়ে পরিস্থিতি সম্পর্কে প্রতিবেদন পেয়েছিল। ঊর্ধ্বতন সরকারি সাক্ষ্য অনুযায়ী, ২১ জুলাই এবং আগস্টের শুরুতে কর্মকর্তারা শেখ হাসিনাকে যে প্রতিবেদন দিয়েছিলেন, সেখানে অতিরিক্ত শক্তি প্রয়োগের বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছিল।
১৯. রাজনৈতিক নেতারা এবং বাংলাদেশের পুলিশ ও সেনাবাহিনীর নেতৃত্বদানকারীরা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছিলেন, যার মাধ্যমে তারা চলমান মানবাধিকার লঙ্ঘনের ব্যাপারে সরাসরি জানতে পেরেছিলেন। তারপরেও রাজনৈতিক নেতৃত্ব বিজিবি, ডিজিএফআই, বাংলাদেশ পুলিশ ও গোয়েন্দা শাখাকে সরাসরি অভিযান চালাতে ও প্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহার করতে নির্দেশ জারি করেছিল। এসবের মধ্যে বিক্ষোভকারী ও বেসামরিক নাগরিকদের বিরুদ্ধে গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘন, বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড ও নির্বিচারে আটকের বিষয়গুলো রয়েছে।
কী ছিল ওএইচসিএইচআর প্রতিবেদনে :
১. যেভাবে শুরু হয় ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং মিশন: ২০২৪ সালের ২৩ জুলাই বাংলাদেশে ছাত্র-জনতার ওপর সরকারের নিরাপত্তা বাহিনী, আওয়ামী লীগ, ছাত্রলীগ ও যুবলীগ ব্যাপক সহিংসতা চালায়। সেই প্রেক্ষিতে জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক হাইকমিশনার ভলকার টুর্ক শেখ হাসিনাকে ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং মিশনের প্রস্তাব দিয়ে চিঠি দিয়েছিলেন; কিন্তু সেই চিঠির কোনো ইতিবাচক সাড়া পাওয়া যায়নি। তারপর ২০২৪ সালের ১৪ আগস্ট অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস জাতিসংঘের মানবাধিকার কার্যালয়ের (ওএইচসিএইচআর) হাইকমিশনারকে টেলিফোনে ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং মিশনের অনুরোধ জানান এবং ২৮ আগস্ট আনুষ্ঠানিকভাবে একটি চিঠিতে আমন্ত্রণ জানান। সেই প্রেক্ষিতে এবং অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের শর্ত মোতাবেক জাতিসংঘ বাংলাদেশে একদল কর্মী পাঠায় ১৬ সেপ্টেম্বর। উক্ত দলে একজন ফরেনসিক চিকিৎসক, একজন অস্ত্র বিশেষজ্ঞ, একজন লিঙ্গ বিশেষজ্ঞ, একজন ওপেন সোর্স বিশেষজ্ঞ, একজন গণমাধ্যম উপদেষ্টা এবং একজন আইনি উপদেষ্টা ছিলেন। উক্ত দল পুরো বাংলাদেশ ঘুরে একটি বিশদ প্রতিবেদন তৈরি করতে না পারলেও বিশ্ববিদ্যালয়, হাসপাতাল, বিক্ষোভের স্থান এবং আহত-নিহতদের পরিবার, ভুক্তভোগী ও প্রত্যক্ষদর্শীদের সাক্ষাৎকার নিয়েছিল। এছাড়া ঘটনাস্থল হিসেবে কুমিল্লা, গাজীপুর, জামালপুর, খুলনা, নারায়ণগঞ্জ, সিরাজগঞ্জ এবং চট্টগ্রাম পরিদর্শন করে।
২. তথ্য অনুসন্ধান পদ্ধতি, প্রমাণের মানদণ্ড ও আন্তর্জাতিক আইনের প্রয়োগ: ওএইচসিএইচআর দল ২৩০টিরও বেশি গোপন সাক্ষাৎকার নিয়েছে, যার মধ্যে ছিল—ভুক্তভোগী, প্রত্যক্ষদর্শী, শিক্ষার্থী, বিক্ষোভে অংশ নেওয়া প্রতিবাদী নেতা, মানবাধিকার কর্মী, বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক, সাংবাদিক, সিভিল সোসাইটির প্রতিনিধি, আইনজীবী, ব্যবসায়ী, বিভিন্ন সেক্টরের বিশেষজ্ঞ, ৩৫ জন নারী, দুইজন নন-বাইনারি ব্যক্তি ও ১০ জন শিশু। এছাড়া ১১টি হাসপাতাল, ২৯টি ফরেনসিক পরীক্ষা, ১৫৩টি চিকিৎসা সংক্রান্ত ঘটনা এবং বিক্ষোভের সময়কার ভিডিও, ছবি, উদ্ধার হওয়া বুলেট, গোলাবারুদ ও প্রাণঘাতী অস্ত্রসহ হাজার হাজার মূল ভিডিও ও ছবি পর্যালোচনা করেছে ওএইচসিএইচআর। সেনাবাহিনী, পুলিশ, র্যাব, আনসার, গোয়েন্দা সংস্থার দল, বিচার বিভাগের বর্তমান ও সাবেক ঊর্ধ্বতন ও মধ্যম স্তরের কর্মকর্তা, কারাগার পরিদর্শন এবং বন্দী আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগের ঊর্ধ্বতন ও মধ্যম স্তরের একাধিক নেতা-কর্মীসহ বিএনপি, জাতীয় পার্টি, জামায়াতে ইসলামী ও ছাত্রশিবিরের বেশ কয়েকজন শীর্ষ ব্যক্তির সাক্ষাৎকার নিয়েছিল জাতিসংঘ।
৩. দমন-পীড়নের তীব্রতা: ১৭ বছর একটানা আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় থাকার কারণে বিচার বিভাগ, নিরাপত্তা বিভাগ ও সরকারের বৃহত্তর আমলাতন্ত্রের ওপর ক্রমবর্ধমান আধিপত্য বিস্তার করেছিল। পরপর তিনটি বিতর্কিত ও প্রশ্নবিদ্ধ নির্বাচন জাতিকে করেছে চরম হতাশ। আয় ও ভোগ বৈষম্য, অর্থপাচার, সীমাহীন দুর্নীতি, ব্যাংক ডাকাতি এবং বড় প্রকল্পের নামে বড় বড় লুটপাট উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছিল। সামাজিক, শিক্ষা ও সাংস্কৃতিক অধিকারের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়েছিল। প্রকাশ্য ও জাতীয় স্বার্থ বিকিয়ে প্রতিবেশী রাষ্ট্রের সাথে অসম চুক্তি এবং সরকারি চাকরিতে কোটা ছাত্রসমাজকে দারুণভাবে প্রভাবিত করেছে। কোটা নিয়ে উচ্চ আদালতের রায়ের প্রতিবাদে শিক্ষার্থীদের ‘রাজাকার’ শব্দে ট্যাগিং করা হয়েছে; ফলে শিক্ষার্থীদের স্লোগান “তুমি কে? আমি কে? রাজাকার, রাজাকার; কে বলেছে? কে বলেছে? স্বৈরাচার, স্বৈরাচার” হয়ে ওঠে প্রতিবাদের ভাষা। ছাত্রলীগ আর পুলিশ যৌথভাবে শিক্ষার্থীদের শান্তিপূর্ণ কর্মসূচিতে হামলা করে। শুধুমাত্র ১৬ জুলাই সারাদেশে ৬ জন নিহত হন; এরমধ্যে রংপুরে আবু সাঈদের হত্যাকাণ্ড সারাদেশে ব্যাপক বিক্ষোভের জন্ম দেয়। সেই বিক্ষোভ থামাতে পুলিশ, বিজিবি, র্যাব ও গোয়েন্দা সংস্থা মাঠে নামে। ১৫ জুলাই থেকে আনসারের ১৪টি ব্যাটালিয়ন এবং সারাদেশে ৫৮ জায়গায় ৪০ হাজার বিজিবি মোতায়েন হয়। ১৬ জুলাই থেকে ডিজিএফআইকে তথ্য দিতে ১০০০ জন কর্মকর্তা ও ৯০০ জন মাঠকর্মী মোতায়েন করা হয়; এছাড়া তথ্য প্রক্রিয়াকরণ ও প্রচার কাজে ১৪০ জন কর্মকর্তা ও এক হাজার জন গোয়েন্দা কর্মী নিয়োজিত ছিল। কয়েক হাজার পুলিশের পোশাক ও রাইফেল ছাত্রলীগকে সরবরাহ করা হয়েছিল সেসময়। বিক্ষোভ দমন অভিযান পরিচালনা ও পরিকল্পনার জন্য স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল ‘কোর কমিটি’ নামে নিয়মিত তার বাসায় বৈঠক করতেন। মন্ত্রী ছাড়াও পুলিশের মহাপরিদর্শক, বিজিবি, র্যাব, আনসার ও গোয়েন্দা সংস্থার প্রধানরা উপস্থিত থাকতেন সেই বৈঠকে। প্রতি বৈঠকে তদারকির জন্য আবার প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরের বেশ কয়েকজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা নিয়মিত নিরাপত্তা প্রধান ও কর্মীদের সাথে সরাসরি বা টেলিফোনে যোগাযোগ রাখতেন এবং এইসব বিষয়ে শেখ হাসিনা সবকিছু সরাসরি নিয়ন্ত্রণ করতেন। কোনো প্রাতিষ্ঠানিক বা স্বাধীন বিধি-বিধান অথবা নিয়মের তোয়াক্কা করতেন না শেখ হাসিনা। বিজিবি, আনসার, এনটিএমসি ও র্যাব স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে রিপোর্ট করত। এনএসআই ও ডিজিএফআই রিপোর্ট করত শেখ হাসিনাকে। এই নিয়ন্ত্রণগুলো রাজনৈতিক দলগুলো ক্ষমতায় থেকে নিজেদের জন্য ব্যবহার করেছে। ১৮ থেকে ২৩ জুলাই ইন্টারনেট বন্ধ রাখা, বিজিবিকে সর্বোচ্চ শক্তি প্রয়োগের নির্দেশ, কারফিউ জারি এবং ২৭ হাজার সেনা মোতায়েন করা হয় বিক্ষোভ দমনে। ২০ ও ২১ জুলাই নিরাপত্তা বাহিনী সারাদেশে সাঁড়াশি অভিযান পরিচালনা করে। ঢাকার বাড্ডা, রামপুরা ও যাত্রাবাড়ীতে সামরিক রাইফেল ও শর্টগান থেকে গুলি চালানো হয়। ২১ জুলাই সুপ্রিম কোর্ট কোটা পাঁচ শতাংশে নামিয়ে এনে রায় দেন; বিক্ষোভকারীরা ততক্ষণে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এবং ছাত্র হত্যাকারী পুলিশ কর্মকর্তা ও ছাত্রলীগের কর্মীদের আইনের আওতায় আনার দাবি জানান। সেই রাতে ছয় প্রধান ছাত্র নেতাকে আটক করে নির্যাতন চালানো হয়; ২৮ জুলাই গোয়েন্দা শাখার জোরপূর্বক আন্দোলন প্রত্যাহারের ভিডিও প্রকাশ করলে এতে সারাদেশে জনতার বিক্ষোভ বেড়ে যায়। শেখ হাসিনা মেট্রোরেল স্টেশন, বিটিভি ভবন ও হাসপাতালে আহতদের দেখতে গিয়ে উক্ত ঘটনার সব দোষ চাপান জামায়াতে ইসলামীর ওপর। ৩০ জুলাই জামায়াতে ইসলামী ও সহযোগী সংগঠনগুলোকে নিষিদ্ধ করে সরকার। পহেলা আগস্ট আসে নতুন দাবি—শেখ হাসিনার পদত্যাগসহ নয় দফা। সারাদেশে নেট বন্ধ করে গণমাধ্যমগুলোকে সরাসরি সরকারের পক্ষে কাজ করতে বাধ্য করে ডিজিএফআই। মাঠে বিক্ষোভকারীদের বিরুদ্ধে অতিরিক্ত বল প্রয়োগে জুনিয়র অফিসারদের সমর্থন ক্রমশ কমে আসে। ৩ আগস্ট সেনাপ্রধান সাবেক ও বর্তমান অফিসারদের নিয়ে বিশাল সেনাসভা করেন; সেখানে স্পষ্টভাবে জুনিয়র অফিসাররা জানিয়ে দেন যে, কোনোভাবেই তারা বিক্ষোভকারীদের ওপর গুলি চালাতে পারবেন না।
বিক্ষোভকারীরা ৫ আগস্ট ‘মার্চ টু ঢাকা’ কর্মসূচি ঘোষণা করে। জেলায় জেলায় বিক্ষোভকারীদের সাথে নিরাপত্তা বাহিনী ও ছাত্রলীগের সংঘর্ষ বাড়তে থাকে; শত শত বিক্ষোভকারী পুলিশের গুলিতে মারা যান। এই সময় সব ধরনের যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায় সারাদেশে। ৪ আগস্ট শেখ হাসিনা তার বাসভবনে জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের একটি জরুরি বৈঠকে সভাপতিত্ব করেন। সেখানে সেনাবাহিনী, বিজিবি, পুলিশ, গোয়েন্দা সংস্থা এবং শিক্ষা, পররাষ্ট্র, তথ্য প্রযুক্তি ও স্থানীয় সরকার মন্ত্রীরা উপস্থিত ছিলেন। তারা ‘ঢাকা মার্চ’ ঠেকাতে পুনরায় কারফিউ জারি করেন এবং তা বাস্তবায়নের জন্য ওই দিনই সন্ধ্যায় দ্বিতীয় দফা বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়; এতে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, সশস্ত্র বাহিনী, পুলিশ, র্যাব ও বিজিবি প্রধানরা উপস্থিত ছিলেন। বিক্ষোভকারীদের ‘ঢাকা মার্চ’ ঠেকাতে পুলিশের পাশাপাশি সেনাবাহিনী ও বিজিবি মোতায়েনের বিষয়ে একমত হয়। ৫ আগস্ট সকালে লাখ লাখ বিক্ষোভকারী ঢাকার কেন্দ্রে মিলিত হয়ে মিছিল ও বিক্ষোভ করেন। ঢাকাসহ সারাদেশে বিক্ষোভকারীদের সাথে পুলিশ ও ছাত্রলীগের দফায় দফায় সংঘর্ষ বাড়তে থাকে এবং নিরাপত্তা বাহিনী নিয়ন্ত্রণ হারাতে থাকে। ভোরে সেনাবাহিনী প্রধান শেখ হাসিনাকে জানান যে, সেনাবাহিনী বিক্ষোভকারীদের তার বাসভবনে পৌঁছাতে বাধা দিতে পারবে না। সেদিনই দুপুর দুইটার দিকে শেখ হাসিনাকে সশস্ত্র বাহিনীর হেলিকপ্টারে ঢাকা থেকে উড়িয়ে নিয়ে যাওয়া হয়। এর কিছুক্ষণ পর বিক্ষোভকারীরা শেখ হাসিনার বাসভবন দখল করে।
৪. রাষ্ট্রীয় বাহিনীর হত্যাকাণ্ডে এবং বিক্ষোভের সময় মৃত্যু ও আহতদের আনুমানিক সংখ্যা: স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জুলাই বিক্ষোভের সাথে সম্পর্কিত ৮৪১ জনের মৃত্যুর রেকর্ড নিশ্চিত করে, যার মধ্যে ১০ জন নারী। আহত ১২,২৭২ জন; যার মধ্যে ৩৯৪ জন নারী ও ৪ জন অন্যান্য হিসেবে তালিকাভুক্ত হয়েছেন। চিকিৎসাকর্মীরা জানান যে, আহতদের চিকিৎসা দিতে বাধা দেওয়া এবং ক্রমাগত মৃতপ্রায় ও আহতদের ভিড়ে রেকর্ড সংরক্ষণ করা সম্ভব হয়নি। অনেক রোগী গ্রেপ্তার এবং হয়রানি এড়াতে নাম প্রকাশ না করে বা মিথ্যা নামে অথবা নিবন্ধন ছাড়াই চিকিৎসা নিয়েছে। ধর্মীয় কারণে এবং বিক্ষোভের সাথে জড়িত থাকার ভয়ে অনেক পরিবার মৃতদেহ ময়নাতদন্ত ছাড়াই দাফন করেছে। কিছু ক্ষেত্রে পুলিশ হাসপাতাল থেকে মৃতদেহ ও মৃত্যুর তথ্য নিয়ে গেছে, যার মধ্যে অধিকাংশই ছিল অজ্ঞাতপরিচয় ব্যক্তি।
এনএসআই-এর তথ্য মতে, জুলাই-আগস্ট আন্দোলনে ৩১৪ জন নিহত হন; যার মধ্যে ৪ থেকে ১৭ বছর বয়সী শিশু ৪০ জন, যা মোট মৃত্যুর ১৩ শতাংশ। মৃত্যুর সম্পূর্ণ হিসাব পেতে নাগরিক সমাজ, স্বাস্থ্য বিভাগ ও এনএসআই-এর তথ্য বিশ্লেষণপূর্বক ওএইচসিএইচআর নিশ্চিত হয়েছে যে, ১৫ জুলাই থেকে ৫ আগস্ট পর্যন্ত কমপক্ষে ১৩ জন নারীসহ এক হাজার চারশো জন বিক্ষোভে নিহত হয়েছেন, যার মধ্যে ১২ শতাংশ শিশু। এইসব হত্যাকাণ্ডের জন্য রাষ্ট্রই দায়ী এবং সবাই বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের শিকার। এইসব হত্যাকাণ্ডে সামরিক রাইফেল, শর্টগান, আগ্নেয়াস্ত্র ও ধাতব বুলেট ব্যবহার করা হয়েছে, যা বাংলাদেশ পুলিশ, আধা-সামরিক এবং সামরিক বাহিনী ব্যবহার করত। ঢাকা মেডিকেল কলেজ ফরেনসিক মেডিসিন বিভাগ ১৩০টি মৃত্যুর ফরেনসিক পরীক্ষা চালিয়েছে এবং এটা নিশ্চিত হয়েছে যে, ১৪০০ জন নিহতের মধ্যে এক হাজারের অধিক মৃত্যু রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা বাহিনীর আগ্নেয়াস্ত্রের কারণে হয়েছে; এইসব অস্ত্র দেশের বেসামরিক নাগরিকদের কাছে কখনোই সহজলভ্য নয়। ওএইচসিএইচআর আরও নিশ্চিত হয়েছে যে, ৬৬ শতাংশ মৃত্যু ঘটেছে উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন সামরিক স্বয়ংক্রিয় এবং আধা-সামরিক স্বয়ংক্রিয় রাইফেল থেকে ছোঁড়া গুলির কারণে; ১২ শতাংশ মৃত্যুর কারণ প্রাণঘাতী ধাতব গুলি ধারণকারী কার্তুজভর্তি শর্টগান থেকে, যা বাংলাদেশ পুলিশ ও আনসার ব্যবহার করত। এছাড়া বুলেটের আঘাতে আহত ব্যক্তিরা অর্ডন্যান্স ফ্যাক্টরি দ্বারা তৈরি ৭.৬২×৩৯ মিমি মারাত্মক রাইফেলের গুলিতে আহত হন। কিছু ক্ষেত্রে ৭.৬২ মিমি ক্যালিবারের বিশেষ বর্মভেদকারী অস্ত্র বেসামরিক নাগরিকদের দেহে পাওয়া গেছে, যা যুদ্ধ পরিস্থিতিতে বর্ম পরা ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ব্যবহার করা হতো, আইন প্রয়োগকারী সংস্থার জন্য নয়। এই গোলাবারুদ বাংলাদেশের কোনো বেসামরিক ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের কেনার নিয়ম নেই। ভিডিও ফুটেজ ও ছবিতে পুলিশ, বিজিবি, র্যাব, আনসার ও সেনাবাহিনীকে এসকেএস, টাইপ ৫৬ ও বিডি-০৮ রাইফেল ব্যবহার করতে দেখা গেছে, যা ওই ক্যালিবারের গোলাবারুদ ব্যবহার করে। এই অস্ত্রগুলো বাংলাদেশ অর্ডন্যান্স ফ্যাক্টরিতে তৈরি হয়।
৫. বিক্ষোভে মানবাধিকার লঙ্ঘন ও নির্যাতন: ওএইচসিএইচআর সকল প্রাপ্ত তথ্য বিশ্লেষণের ভিত্তিতে এই সিদ্ধান্তে পৌঁছেছে যে, শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ দমনে সরকার ও নিরাপত্তা বাহিনী, আওয়ামী লীগ ও তার অঙ্গসংগঠনগুলো সমন্বিত এবং পদ্ধতিগতভাবে পরিকল্পিত উপায়ে যে হত্যা ও নির্যাতন চালিয়েছে, তা ছিল সম্পূর্ণরূপে গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘন। রংপুরের আবু সাঈদকে কোনো আসন্ন হুমকি না থাকা সত্ত্বেও শর্টগান দিয়ে কাছ থেকে বিচারবহির্ভূতভাবে হত্যা করা হয়েছে। বিক্ষোভে না থাকা পথচারী, ঘরের জানালায় শিশু, হেলিকপ্টার থেকে গুলি, বোমা ও গ্রেনেড নিক্ষেপ এবং বিজিবি, র্যাব ও আধা-সামরিক বাহিনীর পুলিশের সাথে মিশে জনতার ওপর নির্বিচারে গুলি চালানো হয়েছে। সেনাবাহিনী কোনো হুমকি বা সতর্কবার্তা না দিয়ে বিক্ষোভকারীদের ওপর রাইফেলের গুলি চালিয়েছে; নিরাপত্তা বাহিনীর এই অভিযানগুলো ছিল বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড ও অন্যান্য গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘন। ছাত্রলীগ প্রতিটি অভিযানে পুলিশের সাথে যৌথভাবে ভোঁতা অস্ত্র, চাপাতি, ছুরি ও অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্র দিয়ে হামলা চালিয়েছে। আহতদের চিকিৎসা সেবা গ্রহণে বাধা, অ্যাম্বুলেন্স অবরুদ্ধ করা, আহত অবস্থায় গ্রেপ্তার, চিকিৎসক ও নার্সদের ভয় দেখানো, হাসপাতালগুলোতে অভিযান, হাসপাতালের মৃত্যুর তথ্য নিয়ে যাওয়া, লাশ গুম, গ্রেপ্তারকৃতদের আইনি পরামর্শের সুযোগ থেকে বঞ্চিত করা, জোরপূর্বক স্বীকারোক্তি আদায়, বৈদ্যুতিক শক, মৃত্যুদণ্ডের হুমকি দেওয়া হয়েছে। ডিজিএফআই, এনএসআই, ডিবি ও অন্যান্য পুলিশ সদস্যরা সক্রিয়ভাবে সাংবাদিকদের ভয় দেখানো, ইন্টারনেট বন্ধ করতে মন্ত্রী পর্যায়ের আদেশ বাস্তবায়ন, বিক্ষোভকারীদের যৌন হয়রানি, শারীরিক যৌন নির্যাতন, ইচ্ছাকৃতভাবে পঙ্গু করা ও লাশ পোড়ানোর মতো ঘটনা ঘটিয়েছে, যা সুস্পষ্ট মানবাধিকার লঙ্ঘন।
৬. আওয়ামী লীগ নির্যাতন: ১৪ ও ১৫ জুলাই রাতে ঢাবি ও তার আশেপাশে ছাত্রলীগ অস্ত্রসহ সজ্জিত ছিল। ১৪ জুলাই রাত তিনটায় রাজু ভাস্কর্যে ছাত্রলীগের সভাপতি সাদ্দাম তার সমর্থকদের উদ্দেশ্যে বলেছিলেন, ১৫ জুলাই থেকে বাংলাদেশে কোনো রাজাকার থাকবে না; এটি প্রতিটি জেলা শহর, বিশ্ববিদ্যালয় ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের জন্য একটি নির্দেশনা ছিল। ১৫ জুলাই আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের বলেন, ছাত্ররা সীমালঙ্ঘন করেছে, আমরা ব্যবস্থা নিতে প্রস্তুত। তিনি ছাত্রলীগকে সাধারণ শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে উসকে দেন। ১৪ জুলাই রাতে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রলীগ শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা করে শত শত শিক্ষার্থীকে আহত করে। শিক্ষার্থীরা উপাচার্যের বাসভবনের সুরক্ষা চাইলে গভীর রাতে প্রধান গেট বন্ধ করে বহু নারী শিক্ষার্থীকে যৌন নির্যাতন করা হয়। একই রাতে রংপুর রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রলীগ ছুরি, চাপাতি, লোহার রড ও লাঠি দিয়ে হামলা চালায়; এতে ছয়জন মারাত্মক আহত হন। ১৫ জুলাই ঢাবিতে ছাত্রলীগ ও বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন পাল্টাপাল্টি বিক্ষোভ করে; দফায় দফায় ছাত্রলীগ লাঠি, পাইপ ও বাঁশ দিয়ে শিক্ষার্থীদের আহত করে। পরদিন আবারও হামলা চালায়; এতে বেশ কয়েকজন নারী শিক্ষার্থী আহত হন। পুলিশ ও ছাত্রলীগ রাতে যৌথভাবে অভিযান চালায়। আহতরা ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি হলে শত শত ছাত্রলীগ কর্মী হাসপাতালে আহত শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা চালায় এবং চিকিৎসক ও নার্সদের আহত করে। ১৫ জুলাই ইডেন মহিলা কলেজের ছাত্রীদেরকে ছাত্রলীগের পুরুষ কর্মীরা এলোপাথাড়ি মারধর ও লাথি মারে; আহত কয়েকজন ছাত্রীকে ঢাকা মেডিকেলে ভর্তি করানো হলে সেখানে পুনরায় ছাত্রলীগ আবারও হামলা চালায়। ১৬ জুলাই হাজার হাজার শিক্ষার্থী ঢাকা কলেজের কাছে সায়েন্সল্যাব এলাকায় এবং পুরান ঢাকার বাহাদুর শাহ পার্ক এলাকায় জড়ো হয়ে বিক্ষোভ করলে ছাত্রলীগ সরাসরি ১৫টি দেশি পিস্তল নিয়ে হামলা করে; দিনভর সংঘর্ষে শত শত শিক্ষার্থী আহত হন। ঢাকা মেডিকেল কলেজে আহতদের জায়গা হচ্ছিল না; এ সময় দুইজনের মৃত্যুর রেকর্ড করা হয়। মোহাম্মদপুরে যুবলীগ প্রকাশ্যে ছাত্রদের ওপর হামলা করে। প্রতিটি হামলা পুলিশ, ছাত্রলীগ ও যুবলীগ যৌথভাবে পরিচালনা করে। সে সময় মনে হয়েছে, পুলিশের কাজ হলো ছাত্রলীগকে সুরক্ষা দেওয়া।
৭. পুলিশ ও আওয়ামী লীগের যৌথ হামলা: ওএইচসিএইচআর ৯৫ জন পুলিশ সদস্যের তথ্য নিশ্চিত করেছে যারা বিক্ষোভের সময় ছাত্রলীগকে অস্ত্র সরবরাহ করেছে। এছাড়া ১০ জন তৎকালীন সংসদ সদস্য, ১৪ জন আওয়ামী লীগ নেতা, ১৬ জন যুবলীগ নেতা ও ১৬ জন ছাত্রলীগ নেতা হামলার জন্য অস্ত্র সরবরাহ করতেন। অধিকাংশ হামলার নেতৃত্ব দিয়েছেন এলাকাভিত্তিক স্থানীয় সংসদ সদস্য, আওয়ামী লীগ নেতা ও সরকারি কর্মকর্তারা। এছাড়া পুলিশ, ছাত্রলীগ ও যুবলীগ যৌথভাবে ১৯ জুলাই রায়েরবাগ মুজাহিদ নগর কেন্দ্রীয় মসজিদে হামলা করে; এতে তিনজন নিহত হন এবং ৮০ জনের অধিক আহত হন। ২ আগস্ট উত্তরা মাইলস্টোন কলেজে যুবলীগ ও পুলিশের যৌথ হামলায় বেশ কয়েকজন নারী শিক্ষার্থী আহত হন। ৩ আগস্ট কুমিল্লায় আওয়ামী লীগ ও পুলিশ যৌথ হামলায় ৬০ জনের অধিক আহত হন এবং সাতজন গুলিবিদ্ধ হন। ৪ আগস্ট সাভারের আশুলিয়ায় পুলিশ ও আওয়ামী লীগ আগ্নেয়াস্ত্রে সজ্জিত হয়ে প্রাণঘাতী গুলি চালায়। একই দিনে মিরপুর, যাত্রাবাড়ী ও উত্তরায় শত শত মানুষ গুলিবিদ্ধ হন। এছাড়া চট্টগ্রাম, ফেনী, নোয়াখালী, লক্ষ্মীপুর, খুলনা, রাজশাহী ও সিলেট এলাকায় পুলিশ ও আওয়ামী লীগের হামলায় ৯ জনের অধিক নিহত হন এবং একই দিনে তিন শতাধিকেরও বেশি মানুষ আহত হন।
৮. হামলায় প্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহার: বিক্ষোভে হত্যাকাণ্ডের প্রায় ১২ শতাংশ ধাতব গুলিভর্তি শর্টগানের কারণে হয়েছিল। হাজার হাজার মানুষ ওই ধাতব গুলির কারণে অন্ধ ও পঙ্গু হয়েছেন। জাতীয় চক্ষুবিজ্ঞান ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালে ৭৩৬ জন চোখের চিকিৎসা নিয়েছেন, যাদের মধ্যে ৫০৪ জনের কোনোদিনই দৃষ্টিশক্তি ফিরে পাওয়ার সম্ভাবনা নেই। সিলেট ওসমানী মেডিকেল কলেজে ৬৪ জন ধাতব গুলিতে আহত হয়ে চিকিৎসা নিয়েছেন, যাদের ৩৫ জনই চোখে আঘাতপ্রাপ্ত ছিলেন। ২০২২-২০২৩ সালে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় পুলিশকে ৩০ লাখের বেশি ধাতব শর্ট কার্তুজ দিয়েছিল, যা ছিল ওই বছরের রাবার বুলেটের দ্বিগুণ। ওএইচসিএইচআর এটা নিশ্চিত হয়েছে যে, বিক্ষোভ দমন করার ভিন্ন পদ্ধতি প্রয়োগ না করে সরাসরি প্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহার হয়েছে এবং ৮৭ শতাংশ বিক্ষোভকারীর মাথায় ও বুকে ধাতব বুলেট পাওয়া গেছে। ওএইচসিএইচআর এটাও নিশ্চিত হয়েছে যে, ১৮ জুলাই প্রায় একশত, ১৯ জুলাই প্রায় তিনশত এবং ৪ আগস্ট প্রায় চারশত মানুষ নিরাপত্তা বাহিনী ও আওয়ামী লীগের হাতে নিহত হয়েছেন।
৯. রামপুরা, বাড্ডা, যাত্রাবাড়ী, উত্তরা ও আশুলিয়ায় হামলা: ১৮ জুলাই উত্তরা ও এর আশেপাশে র্যাব, আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ন, বিজিবি, আনসার ও সশস্ত্র অস্ত্রধারী আওয়ামী লীগ একযোগে বিক্ষোভকারীদের ওপর হামলা চালায়; এতে কমপক্ষে ৯১ জন আহত ও ছয়জন নিহত হন। নিহত ছয়জনের মধ্যে পানি বিতরণকালে মীর মুগ্ধ ছিলেন একজন। একই সময় ঢাকার রবীন্দ্র সরণির কাছে প্রতিবাদী এক নেতাকে কাছ থেকে মাথায় গুলি করা হয়; ভাগ্যক্রমে তিনি বেঁচে যান। তারপর তার দিকে সাউন্ড গ্রেনেড ছোঁড়া হয় এবং আবারও দুটি ধাতব গুলি পেছন থেকে তার মাথায় লাগে; একটি গুলি চোখ দিয়ে ও অপরটি নাকের পাশ দিয়ে বেরিয়ে যায়। এতে তার ডান কানের ৯৫ শতাংশ শ্রবণশক্তি হ্রাস পায় এবং মস্তিষ্কের হাড় ভেঙে ডিপ্রেশন হয়ে যায়। একজন ছাত্রকে পাওয়া গেছে যার পায়ে ৪২টি ধাতব বুলেট লেগেছিল। আজিমপুরে ১৭ বছর বয়সী এক স্কুলছাত্র মাটিতে লুটিয়ে পড়লে পুলিশ অফিসার পিস্তল ঠেকিয়ে তার বুকে গুলি করে এবং তার লাশ নিয়ে যায়। তিনদিন হাসপাতাল থেকে তার লাশ নিতে দেওয়া হয়নি যতক্ষণ না মৃত ছাত্রের মা-বাবা স্বাভাবিক মৃত্যুর ঘোষণাপত্রে স্বাক্ষর করেছেন। ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের ভেতরে ৬০ জন পুলিশ ঢুকে গ্রেনেড ও কাঁদানে গ্যাস ছোঁড়ে; ছাত্ররা ধাওয়া দিলে পাশের কানাডিয়ান ইউনিভার্সিটির ছাদে আশ্রয় নেয় পুলিশ। বিক্ষুব্ধ ছাত্ররা নিচে আগুন ধরিয়ে দিলে পরে র্যাবের হেলিকপ্টার এসে তাদের উদ্ধার করে। ১৮ জুলাই নরসিংদী কারাগার এলাকায় পুলিশের ধাওয়ায় ১৫ বছরের এক বালক রাস্তার পাশে পড়ে যায়; সে বাঁচার আকুতি জানিয়ে বারবার কান ধরে উঠ-বস করছিল, সেই অবস্থায় তাকে প্রকাশ্যে গুলি করে হত্যা করে পুলিশ। ১৯ জুলাই ওই হত্যার প্রতিবাদে কারাগার এলাকায় বিক্ষোভ করলে পুলিশ জনতার ওপর অভিযান চালায়; এতে বিক্ষোভ চলাকালে ৮০০ বন্দী পালিয়ে যায়। ওই দুইদিনে স্থানীয় হাসপাতালে ৩০০-এর বেশি পুলিশের গুলিতে আহত রোগী ভর্তি হয়। ১৯ জুলাই রামপুরা এলাকায় সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত ৬০০-এর অধিক মানুষ পুলিশের গুলিতে আহত হন; এসময় ১০ বছরের শিশুসহ ২০ জন নিহত হন। একই এলাকায় বিকেলে রামপুরার এক যুবক স্বাভাবিকভাবে হেঁটে যাচ্ছিলেন; পুলিশ ও বিজিবি রাস্তা আটকে দিলে যুবক সংঘর্ষ এড়াতে রামপুরা থানা সংলগ্ন নির্মাণাধীন একটি ভবনের উপরে ভয়ে রডে ঝুলতে থাকেন। ঝুলন্ত অবস্থায় কাছ থেকে দুই পুলিশ অফিসার—একজন উপর থেকে অপরজন নিচ থেকে—তাকে গুলি করে; তিনি নিচে পড়ে গেলে সেখানেও তাকে দুটি গুলি ছোঁড়া হয়। তার দেহে ছয়টি ধাতব গুলির ক্ষত পাওয়া গিয়েছিল। ১৮, ১৯, ২০ ও ২১ জুলাই যাত্রাবাড়ী এলাকায় ১২০০-এর অধিক মানুষ আহত হন; একই সময়ে যাত্রাবাড়ী এলাকায় পাঁচজন নিহত হন। ২১ জুলাই স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, পুলিশের মহাপরিদর্শক ও ডিএমপি কমিশনার যাত্রাবাড়ী এলাকা পরিদর্শনে যান। ভিডিওতে দেখা যায় এক পুলিশ কমান্ডার বলছে, “একটারে গুলি করি একটাই মরে, বাকিডি যায় না, নড়েও না”। গাজীপুর ও আশুলিয়ায় পুলিশ ৬/৭ জনের মৃতদেহ গাড়িতে তুলে থানার ভেতর আগুন দিয়ে জ্বালিয়ে দেয়। ওএইচসিএইচআর নিশ্চিত করেছে যে, আগুন দেওয়া ৬ জন বিক্ষোভকারীর লাশের মধ্যে একজন তখনও জীবিত ছিলেন। পুলিশ ও র্যাবের মহাপরিচালক উভয়ই স্বীকার করেছেন যে, র্যাবের হেলিকপ্টার বিক্ষোভ দমনে ব্যবহার করা হয়েছে। হেলিকপ্টার থেকে ৭৩৮টি কাঁদানে গ্যাস শেল, ১৯০টি সাউন্ড গ্রেনেড ও ৫৫৭টি স্টান গ্রেনেড ব্যবহার হয়েছে; তবে ধাতব বুলেট ব্যবহার করা হয়েছে কী না তা জানা যায়নি। তবে ঢাকা ও এর আশেপাশে বাড়ির ছাদে ছয় শিশুর মৃত্যু হয়েছে, যাদের দেহে ধাতব বুলেট ও প্রাণঘাতী অস্ত্রের বুলেট পাওয়া গেছে।
১০. গণগ্রেপ্তার, আটক ও সাংবাদিক নির্যাতন: জুলাই আন্দোলনে অভিযানের সময় গ্রেপ্তার হওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে ৮৫ শতাংশ ছাত্র ও সাধারণ নাগরিক এবং ১৫ শতাংশ বিরোধীদলের নেতা-কর্মী। পুলিশের দেওয়া তথ্য অনুসারে, ২০২৪ সালের ১ জুলাই থেকে ৪ আগস্ট পর্যন্ত ৩৫ দিনে ৬৩ জন শিশুসহ ১০,৫২৫ জন পুরুষ এবং ৩৪ জন নারীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। শুধু ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ ২৪ জন শিশুসহ ৩,০৮৩ জন পুরুষ এবং র্যাব ১,১১৮ জন পুরুষ ও ৩৪ জন নারীকে গ্রেপ্তার করে। কারফিউ ও ইন্টারনেট বন্ধ থাকায় এ তথ্য যথোপযুক্তভাবে নথিভুক্ত করা যায়নি। সবমিলিয়ে সে সময় নিরাপত্তা বাহিনী ১১,৭০২ জনকে গ্রেপ্তার করেছে, যার অধিকাংশ ছিল স্বেচ্ছাচারী। আহত ব্যক্তিদের হাসপাতাল থেকে ধরে এনে মিন্টো রোডের ডিবি কার্যালয়ে তিনদিন আটক রেখে বৈদ্যুতিক শক দেওয়া, নখ তুলে ফেলা, আঙুল ভেঙে দেওয়া এবং আঘাতের স্থানে বারবার লাথি মারা হয়েছিল। জুলাইয়ের শেষদিকে বিজিবি ও পুলিশ ঢাকার বেশ কিছু সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালে অভিযান পরিচালনা করে এবং আহত রোগীদের গ্রেপ্তার ও গালাগালি করে চিকিৎসা সেবায় ব্যাঘাত ঘটায়। তারা বলেছিল—বিক্ষোভকারীরা মৃত্যুর যোগ্য। এ সময় বহু আহত রোগী গ্রেপ্তার এড়াতে হাসপাতালে চিকিৎসা না নিয়ে বাসায় থাকেন, এতে করে তাদের দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতি হয়। জুলাইয়ের শেষ দিকে বিএনপি ও জামায়াতের শত শত মধ্যম সারির নেতাকে গ্রেপ্তার করা হয়। পুলিশের কাছে গ্রেপ্তারের তথ্য থাকা সত্ত্বেও ওই নেতাদের তিনদিনেও আদালতে তোলা হয়নি; থানা হাজত ও ডিবি কার্যালয়ে রেখে নির্যাতন করা হয়। একাধিক ভুক্তভোগী এই তথ্য নিশ্চিত করেছেন যে, মিন্টো রোডের ডিবি কার্যালয়ে ভিক্টিমদের সাথে পরিকল্পিত উপায়ে নানা ধরনের নির্যাতন করা হয়েছে। নারী বন্দীদের সাথে যৌন হয়রানি করা হয়েছে এবং শিশুদের আটকে রেখে পিতা-মাতাকে এনে মিথ্যা তথ্য নেওয়া হয়েছে। ১৫ জুলাই থেকে ৫ আগস্ট পর্যন্ত কমপক্ষে ৬ জন সাংবাদিক নিহত হয়েছেন এবং সারাদেশে প্রায় দুই শতাধিক সাংবাদিক আহত হয়েছেন। পুলিশের মহাপরিচালক স্বীকার করেছেন যে পুলিশই সাংবাদিককে হত্যা করেছে এবং এজন্য ক্ষমা চেয়েছেন। ওএইচসিএইচআর ঢাকা, গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জ, রংপুর ও সিলেটে ৩৫৫ জন শিশু নিহতের তথ্য সংগ্রহ করেছে, যাদের প্রত্যেকের দেহে ধাতব বুলেটের আঘাত রয়েছে। ধানমন্ডি ৩২ নম্বরে ১২ বছর বয়সী একটি শিশুর দেহে ২০০-এর অধিক ধাতব বুলেট পাওয়া গেছে। নিহত শিশুদের মধ্যে মায়ের কোলে মারা যায় দুই শিশু, যারা মা-বাবার সাথে বিক্ষোভে অংশ নিয়েছিল।
১১. অন্যান্য: আওয়ামী লীগ ও পুলিশ জুলাই আন্দোলনকে ভিন্নভাবে ব্যাখ্যা করার জন্য আদিবাসী গোষ্ঠী, হিন্দু, আহমদীয় মুসলিম এবং মন্দির, মাজার ও অন্যান্য উপাসনালয়ে হামলা চালিয়েছে এবং আগুন দিয়ে জ্বালিয়ে দিয়েছে। ওএইচসিএইচআর সুস্পষ্ট প্রমাণ পেয়েছে যে, জুলাই-আগস্ট মাসে এই ধরনের হামলা ভিন্নমতকে দমনের উপায় ও দায় চাপানোর জন্য করা হয়েছে। এই সংখ্যালঘু হামলায় কিছু জায়গায় যৌন সহিংসতার অভিযোগ স্পষ্ট হয়েছে।
ওএইচসিএইচআর-এর তদন্তের বেশিরভাগ তথ্য শুধুমাত্র জুলাই মাসের ১৮, ১৯, ২০ ও ২১ তারিখের। ইন্টারনেট বন্ধ থাকায় জুলাই মাসের শেষ দিকের ভয়াবহতা উঠে আসেনি। তাই আজ শহীদ শরীফ ওসমান বিন হাদীর কথা বারবার মনে পড়ছে; তিনি বলেছিলেন, “আপনারা জানেন না জুলাইয়ে কী হয়েছে?” জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং প্রতিবেদন জুলাই আন্দোলনের একটা চিত্র মাত্র, ভয়াবহতা আরও গভীরে…
লেখক পরিচিতি:
মো. আবদুল বাতেন
সাংবাদিক, বাংলাদেশ বেতার।
