৩রা জুন, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ

নিজস্ব প্রতিবেদক: রাষ্ট্রীয় বাহিনী পুলিশকে ক্ষমতাসীন কোনো দলের লাঠিয়াল বাহিনীতে পরিণত করা যাবে না। পুলিশে দায়িত্বরত সদস্যরা কোনো রাজনৈতিক কর্মসূচিতে অংশ নিতে পারবে না। একই সঙ্গে বিরোধী মতের ওপর অতিরিক্ত বল প্রয়োগ করা যাবে না। গঠন করা হবে জাতীয় পুলিশ কমিশন বা ন্যাশনাল পুলিশ কমিশন (এনপিসি)। এই এনপিসি জবাবদিহি করবে সংসদীয় স্থায়ী কমিটির কাছে। পাশাপাশি পুলিশের নিয়োগ পদ্ধতিতেও সংস্কারের সুপারিশ থাকছে। এমন সব সুপারিশ ও প্রস্তাব রেখে আগামী ১৫ জানুয়ারি প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের কাছে প্রতিবেদন জমা দেবে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠিত পুলিশ সংস্কার কমিশন। কমিশনের একাধিক সদস্য কালবেলাকে বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে কমিশনের চেয়ারম্যান সফর রাজ হোসেন কালবেলাকে বলেন, ‘প্রাণহানি এড়াতে ইউরোপীয় দেশগুলোতে পুলিশের জন্য নির্ধারিত কিছু মানদণ্ড আছে। ওইসব মানদণ্ড অনুযায়ী প্রাণঘাতী নয়; শুধু এমন অস্ত্র পুলিশকে দিতে সুপারিশ করা হচ্ছে। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের প্রাণহানির মতো আর যেন ট্র্যাজেডি না হয়, সেজন্য পুলিশকে প্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহার বন্ধ করা তাদের মূল লক্ষ্য।’

পুলিশ সংস্কার কমিশনের এক সদস্য আলাপকালে কালবেলাকে বলেন, ‘আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর ওপর রাজনৈতিক প্রভাব একটি বড় সমস্যা। যে রাজনৈতিক দল যখন ক্ষমতায় আসে, তখন পুলিশসহ সব রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের ওপর তাদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করার প্রবণতা দেখা যায়। বিষয়টি বেশ জটিল। এখানে শুধু পুলিশকে আলাদাভাবে দেখা যায় না।’ পুরো বিষয়ে প্রতিবেদনে থাকবে উল্লেখ করে ওই সদস্য বলেন, ‘সরকারি কর্মচারীদের জন্য কিছু আচরণবিধিমালা আছে। সেগুলো তাদের মেনে চলতে হবে। পদায়ন-পদোন্নতিরও কিছু বিধিমালা আছে, সেগুলোও পালন করা জরুরি। সরকার একটি স্বাধীন জাতীয় পুলিশ কমিশন (এনপিসি) গঠন করবে। তারা সংসদীয় স্থায়ী কমিটির কাছে জবাবদিহি করবে। প্রয়োজনে কমিশনে উত্থাপিত বিষয়ে তারা (সংসদীয় স্থায়ী কমিটি) হেয়ারিং কল (শুনানি) করবে। পুলিশ সদস্যদের পেশাগত কাজের জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। ১৮৬১ সালের পুলিশ আইনের বেশকিছু ধারা সংশোধনের সুপারিশ থাকবে।’

আরেক সদস্য বলেন, কনস্টেবল, উপপরিদর্শক (এসআই) ও সহকারী পুলিশ সুপার (এএসপি) এই তিনটি প্রারম্ভিক পদে পুলিশে সব নিয়োগ হয়। নিম্নপদে যারা নিয়োগ পান, তাদের অনেকে যোগ্য হলেও উচ্চপদে যেতে পারেন না। এই নিয়োগ প্রক্রিয়া সংস্কার করে তিনটি ধাপের বদলে প্রারম্ভিক নিয়োগের দুটি ধাপ চালুর বিষয়েও সুপারিশ করতে পারে সংস্কার কমিশন। এ ক্ষেত্রে শুধু কনস্টেবল ও এএসপি পদ থাকার সুপারিশ করা হতে পারে। কমিশনের একজন সদস্য জানান বিষয়টি এখনো চূড়ান্ত করা হয়নি। আলাপ-আলোচনা চলছে।

গত ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতন হলে ৮ আগস্ট অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ক্ষমতা নেয়। ওই সময় দেশে সবচেয়ে ভঙ্গুর অবস্থায় ছিল পুলিশ বাহিনী। পুলিশ বাহিনীর নেতৃত্বে আমূল পরিবর্তন আনা হয়। ভেঙে পড়া পুলিশি ব্যবস্থা ঢেলে সাজানো হয়। ওই অবস্থায় জনমুখী, জবাবদিহিমূলক, দক্ষ ও নিরপেক্ষ পুলিশ বাহিনী গড়ে তুলতে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ‘পুলিশ সংস্কার কমিশন’ গঠন করে। গত ৩ অক্টোবর মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ থেকে এ-সংক্রান্ত প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়। কমিশনের প্রধান হিসেবে সাবেক সিনিয়র সচিব সফর রাজ হোসেনকে দায়িত্ব দেওয়া হয়। কমিশনের অন্য সদস্যরা হলেন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জননিরাপত্তা বিভাগের অতিরিক্ত সচিব আবু মমতাজ সাদ উদ্দিন আহমেদ, মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের সাবেক মহাপরিচালক ও সাবেক অতিরিক্ত সচিব মোহাম্মদ ইকবাল, সাবেক বিভাগীয় কমিশনার ও যুগ্ম সচিব মোহাম্মদ হারুন চৌধুরী, সাবেক অতিরিক্ত পুলিশ মহাপরিদর্শক শেখ মো. সাজ্জাত আলী (বর্তমানে ঢাকা মহানগর পুলিশ কমিশনার), পুলিশের উপমহাপরিদর্শক মো. গোলাম রসুল, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের অধ্যাপক শাহনাজ হুদা, মানবাধিকার কর্মী এ এস এম নাসিরউদ্দিন এলান এবং একজন শিক্ষার্থী প্রতিনিধি। কমিশনকে ৯০ দিনের মধ্যে সুপারিশসহ প্রতিবেদন দাখিল করতে বলা হয়েছে। সে হিসেবে কমিশন গত ৩১ ডিসেম্বরের মধ্যে প্রতিবেদন জমা দেওয়ার কথা ছিল। আগামী ১৫ জানুয়ারি তারা প্রধান উপদেষ্টার কাছে প্রতিবেদন জমা দেবে।

এসব বিষয়ে পুলিশ সংস্কার কমিশনের প্রধান বলেন, ‘আমরা স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টার সঙ্গে দেখা করে বলেছি, সরকারি, আধাসরকারি ও স্বায়ত্তশাসিত চাকরিতে পুলিশ ভেরিফিকেশনে রাজনৈতিক পরিচয় যাচাই তুলে দিতে। বর্তমানে আধাসরকারি কিংবা ব্যাংকের চাকরির জন্য পুলিশ ভেরিফিকেশন করতে হয়। পুলিশ ভেরিফিকেশনের এ পদ্ধতি ৯৬ বছর ধরে চলে আসছে। ব্রিটিশ আইনের ম্যানুয়াল অনুযায়ী এখানে কয়েক ধরনের প্রশ্ন এবং তদন্ত করা হয়। এতে অনেক সময় অনেক যোগ্য চাকরিপ্রার্থী বাদ পড়ে যান। দ্বিতীয়ত, আরেকটি বিষয় প্রচলিত আছে, আত্মীয়স্বজনের মধ্যে কেউ রাজনীতি করে কি না এবং রাষ্ট্রবিরোধী কেউ আছে কি না। এটা ব্রিটিশদের আঙ্গিকে চিন্তা করা হতো। সম্প্রতি এমন অনেক অভিযোগ এসেছে, কারও আত্মীয় বা স্বজন রাজনীতি করে; কিন্তু সরকারি দল করে না, তাদের অনেকের ক্ষেত্রে এসব যুক্তি দেখিয়ে চাকরি দেওয়া হয়নি। এতে অনেক যোগ্য প্রার্থী চাকরি থেকে বঞ্চিত হয়েছেন।’

কমিশনের একজন সদস্য বলেন, আমরা পেশাগত জীবনে ইউরোপ, আমেরিকাসহ বিভিন্ন দেশ সফর করেছি, প্রশিক্ষণ নিয়েছি। সেখানকার পুলিশ কীভাবে পরিচালিত হয়, সেটা দেখেছি। সেখানে পুলিশ পরিচালনার যে মানদণ্ড আছে, সে অনুযায়ী আমরাও একটি মানদণ্ড তৈরি করতে চাই। উন্নত বিশ্বে পুলিশ স্থানীয় সরকারের জনপ্রতিধিদের সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করে। আমাদের দেশে স্থানীয় সরকার যে মানের হওয়া দরকার ছিল, সেটা হয়নি। গণতান্ত্রিক চর্চার অভাব, সঠিকভাবে স্থানীয় সরকার নির্বাচন না হওয়া, দুর্বৃত্ত ও রাজনৈতিক দুর্বৃত্তদের অনেকে স্থানীয় সরকার নির্বাচনে অংশ নিয়ে জনপ্রতিনিধি হয়ে যায়। এটাও আমাদের দেশের পুলিশ ও আইনশৃঙ্খলার জন্য সমস্যা তৈরি করে। আমরা যদি ইউরোপীয় দেশগুলোর মতো গণতান্ত্রিক চর্চা করতে পারতাম, অপরাধ নিয়ন্ত্রণে সিভিল সোসাইটিও ভূমিকা রাখতে পারত, তাহলে অনেক কিছু সহজ হয়ে যেত। কিন্তু বাস্তবে সেটা হচ্ছে না।’

সুপারিশ সম্পর্কে পুলিশ সংস্কার কমিশনের প্রধান সফর রাজ হোসেন বলেন, আমরা যেসব সুপারিশ করব, তার মধ্যে স্বল্পমেয়াদি, মধ্যমেয়াদি ও দীর্ঘমেয়াদে বাস্তবায়নযোগ্য সুপারিশ থাকবে। কিছু সুপারিশ বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে অর্থের দরকার আছে। কিছু ক্ষেত্রে সরকারি আইন ও বিধিবিধান পাল্টানোর সুপারিশ থাকবে। সেগুলো পরিবর্তন করা সময়সাপেক্ষ বিষয়।

সর্বশেষ

Calendar
Mon Tue Wed Thu Fri Sat Sun
1234567
891011121314
15161718192021
22232425262728
2930  
Scroll to Top