শিমুল জাবালি’র কবিতা ১. শিশিরমহাজন রাত হইতেছে গভীর, ঘাসে বইসা কী করো শিশিরমহাজন?জোছনাগদি থাইকা আলো নিয়া ধার-বিনা সুদে, বিনা দলিলে;সে জানে না তার ঋণের বহর, সারারাত ঝিকমিক করে, ঘুমায় রাজার হালেভোরবেলা সুরুজ আসে পাওনাদার হইয়া, ফোঁটায় ফোঁটায় উসুল কইরা নেয় বাষ্পে—সে টেরও পায় না কখন নিঃস্ব হলো, দুপুরে তার মাথা নত, ম্লান, গরিব। তবু সন্ধ্যা নামলে আবার আসে মহাজন, আবার ধার, আবার ঝিকিমিকি;নিঃস্ব হওয়া আর ধনী হওয়ার এই দোলনায়-দুলতে দুলতে ঘাসের জীবন যায়,অভিযোগ নাই, মামলা নাই, সবুজের কোনো উকিল লাগে না। এই লেনদেনের নাম কেউ রাখে শোষণ, কেউ রাখে করুণাআমি রাখি সংসার আমার মা-ও এমন ছিলেন—সারাদিন বিলাইতেন, রাইতে নিঃস্বতবু পরদিন দেখি আঁচলভরা আলো; কোন গদি থিকা আনতেন আজও জানি না,মায়েদের মহাজন সম্ভবত আসমানে থাকেন, খাতা রাখেন না, সুদ নেন দোয়ায়। আমিও ধার করি আজকাল, শিশিরমহাজননিশ্বাসব্রতে জমা রাখি ঘুম– শোধ হবে না জানি,তবে মহাজনি আইনে প্রেমিকদের জেল হয় না,হয় নির্জনতা ও যাবজ্জীবন। ২. পাতাঝরার ডাকঘর হেমন্ত এলে গাছেরা ডাকঘর খুইলা বসে, প্রতিটি ঝরাপাতা এক একখানা চিঠিপ্রাপক: মাটি, প্রেরক: আসমান, বাহক: হাওয়া, বেতনবিহীন।চিঠিগুলা পড়তে জানে কেবল পিঁপড়ারা, সারি বাইন্ধা আসে, অক্ষরে অক্ষরে হাঁটে—জরুরি খবরগুলা বইয়া নিয়া যায় মাটির তলায়–শিকড়েরা খবর পাইয়া নড়েচড়ে বসে, বসন্তের প্রস্তুতি লয় আন্ধারে বইসাই উপরে যারে আমরা মরা মৌসুম বলি, নিচে তার নাম চিঠি বিলির কালকুড়ানি মেয়েটা পাতা কুড়ায় জ্বালানির লাইগা,সে জানে না কত চিঠি পুড়াইয়া ভাত রান্ধে; জানলে হয়তো পড়ত দুই একখান না জানাই ভালো–চিঠি পোড়ানো আগুনে ভাত নাকি মিঠা হয় বেশি, লেখা আছে হাওয়ার ডাকবিধিতে–আমিও চিঠি লেখতাছি বহুদিন ধইরা- পাঠাই না, জমাইঝরার সময় হইলে গাছের কাছে শিখতে যাব, ক্যামনে এত সহজে ছাইড়া দেওয়া যায়নিজের লেখা, নিজের রং, নিজের গ্রীষ্মকাল! গাছ শিখাইব, গাছের কাছে টিউশন ফি লাগে না—লাগে খালি ধৈর্য, আর একখান হেমন্ত ডাকঘর বন্ধ হয় মাঘের শীতে-গাছেরা তখন ন্যাড়া, নিঃস্ব ও নীরব;মনে হয় দেউলিয়া, আসলে অবসর সব বিলি শেষ, এইবার বিশ্রাম যে ডাকপিয়নের চিঠি ফুরায়, তার ঘুমের নাম শীতকাল ৩. নদীর নাইওর আশ্বিন মাসে নদী নাইওর যায় সমুদ্রের বাড়িযাওয়ার আগে ঘাটে ঘাটে কুশল রাইখা যায়কলসির কানায় কানায় ঢাইলা যায় শেষ বিকালের রং নদীর মা নাই, তবু বাপের বাড়ি বইলা কথা থাকে সবারই;পাহাড়ের কথা মনে হইলে নদীরও বুক ভার হয়,উজানের দিকে চাইয়া থাকে অপলক স্রোতের বিপরীতে ফেরা যায় না বইলাইসে এত গান জানে অক্ষমতা থিকাই জন্মায় সুর, জানে মাঝিরাজাইনাই তারা ভাটিয়ালিতে এত দরদ ঢালে যাওয়ার পথে নদী যা দেখে সব মনে রাখে:কোন ঘাটে কোন বধূ চুল ভিজাইলোকোন ছেলে প্রথম সাঁতার শিখলো কাইন্দা কাইটাকোন বুড়া বিকালবেলা একলা বইসা রইলোকারে যেন খুঁজলো জলের ভিতর! নদী সব লেইখা রাখে ঢেউয়ের খাতায়, সমুদ্রে গিয়া জমা দেয়–সমুদ্র এত বড় এই কারণেইপৃথিবীর সব নদীর মুখস্থ কথা– তার বুকে রাখা আছে, নোনামৃত। মানুষ ভাবে সমুদ্রের জল খাওয়া যায় না লবণে–আসলে ওই জলে এত কাহিনি গোলাএত বিদায়, এত ঘাট, এত অপেক্ষাযে গিলতে গেলে গলা ধইরা আসে লবণ তো উছিলামানুষ কান্দনের স্বাদ চিনা ফালাইবো বইলাইসমুদ্র নিজেরে অখাদ্য কইরা রাখছে নাইওর শেষে নদী ফিরে না ঠিকইতবে বর্ষায় তার বইনেরা আসে মেঘ হইয়াবাপের বাড়ির খবর লইয়া;বৃষ্টির শব্দে কান পাতলে শোনা যায়পাহাড় ভালা আছে, ঝরনারা ভালা আছেখালি তোমাগো লাইগা মন পোড়ে এই খবরটুকুর লাইগাইশুকনা খালেরাও প্রতি আষাঢ়ে দুই কূল ভাসাইয়া কান্দে ৪. ঘুমের মুসাফির ঘুম এক দূরের মুল্লুক, ভিসা লাগে নাতবু সবাই পৌঁছাইতে পারে না রোজ আমি রাতভর সীমান্তে বইসা থাকি,চোখের চেকপোস্টে আটকা পড়ে স্বপ্নের কাফেলা যারা সহজে ঘুমায় তারা জানে না, তারা কত বড় জমিদারির মালিকবালিশে মাথা রাখলেই খুইলা যায় সদর দরজাপক্ষিরাজ ছাড়াই পাড়ি দেয় সাত সমুদ্র আর আমরা যারা জাইগা থাকিআমরা সেই মুল্লুকের ভিখারিদুয়ারে দুয়ারে ঘুরি, ভাঙা থালা হাতেদুই মুঠ তন্দ্রা পাইলে বর্তে যাই শেষরাতে করুণা হয় কারোআধা ঘুম জোটে, ছেঁড়া কাঁথার মতনগায়ে দিলে পাও বাইর হইয়া থাকেপাও ঢাকলে বুক সেই আধা ঘুমের ভিতর যে স্বপ্ন আসে–সেও আধা, রংচটা, শব্দহীন সিনেমা তবু দেখি, গরিবের আবার বাছাবাছি কী! ডাক্তার বড়ি দেয়, বলে খাইলেই ঘুমবড়ির ঘুম আর মায়ের কোলের ঘুমএক জিনিস না, ডাক্তাররে কই নাইসে বুঝবো না, তার মা তো বাঁইচা আছে তবু ভোরের দিকে, আজানের একটু আগেপাখি ডাকার একটু আগে যে নীরবতাসেই নীরবতাটুকু মুসাফিরের সরাইখানা ওইখানে সব জাগনা মানুষ এক কাতারে বসে–কেউ কারে চিনে না, তবু সবাই স্বজন;নিদ্রাহীনতার এই এক সুখসে অন্তত একলা ঘুমাইতে দেয় না কাউরে ৫. আলোর ওয়ারিশ আমার কিছু নাই, তবু উইল কইরা যাইতে চাইসন্তানের নামে লেইখা যাই ভোরবেলাটা,শিশিরের দানাগুলা, দোয়েলের প্রথম শিসআর কার্তিকের ভোরে ধানখেতের উপর দিয়াভাইসা আসা সেই গন্ধ—যার কোনো নাম হয় নাই আজওহইলে সবাই কিনতে চাইতো জমিজমা নাই, দালান নাই, ব্যাংকব্যালেন্স নাইকেউ জিগাইলে কমু, আসমানে জমা রাখছি সবমেঘে মেঘে আমার ব্যাংক, বৃষ্টিতে আসে কিস্তিরংধনু আমার চেকবই, সাত পাতার লোকে হাসবো, হাসুকযে জীবনে হাসাইতে পারছিসে জীবন লোকসানের না সন্তানরে শিখাইয়া যাবো খালি দুইটা জিনিস:ক্যামনে তাকাইতে হয়, আর ক্যামনে থামতে হয় তাকাইলে দেখবা ঘাসের ডগায় সূর্য দুলতেছেথামলে শুনবা পাতার ভিতর হাওয়ার সংসারএই দুই বিদ্যা জানলে কেউ গরিব নানা জানলে রাজাও ফকিরসিন্দুকভরা সোনার ভিতর বইসা সে খুঁজবো-কী জানি নাই, কী জানি নাই! আলো কারো একলার সম্পত্তি না, এইটুকুই আমার দলিলসাক্ষী রইলো ঘাস, নদী, ভোরের আজান, সন্ধ্যার শাঁখওয়ারিশ হইতে কোনো আদালতে যাইতে হয় নাচোখ খুইলা তাকাইলেই তামিল হয় উইল যেদিন আমি থাকব নাসেদিনও ভোর হবে, শিশির নামবেদোয়েল শিস দিবো কারফিউ না