জাতিসংঘের চোখে জুলাই: ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং প্রতিবেদন
জাতিসংঘের চোখে জুলাই: ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং প্রতিবেদন মো. আবদুল বাতেন ২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলন দমন করতে শেখ হাসিনার সরকার এদেশে পরিকল্পিতভাবে বিচারবহির্ভূত শত শত হত্যাকাণ্ড, হাজার হাজার বিক্ষোভকারীকে গুরুতর আহত করা এবং গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের সাথে জড়িত ছিল। শেখ হাসিনার সরকার ও তার নিরাপত্তা বাহিনী এবং গোয়েন্দা সংস্থাগুলো আওয়ামী লীগের সাথে সংশ্লিষ্ট হত্যা, ধর্ষণ, খুন-গুম, গ্রেপ্তার, আটক, নির্যাতন, শিশুহত্যা, লুটতরাজ ও অন্যান্য নানাবিধ অপরাধের সাথে জড়িত ছিল। সেই প্রেক্ষিতে জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক হাইকমিশনারের কার্যালয় (ওএইচসিএইচআর) বাংলাদেশে ২০২৪ সালের ১ জুলাই থেকে ৫ আগস্টের মধ্যে সংঘটিত মানবাধিকার লঙ্ঘন ও নির্যাতনের অভিযোগে একটি স্বাধীন তদন্ত পরিচালনা করে, যাকে বলা হয় জাতিসংঘের ‘ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং প্রতিবেদন’। জাতিসংঘের মানবাধিকার কমিশন যে কারণে উক্ত ঘটনাকে (২৪-এর জুলাই আন্দোলন দমন) আন্তর্জাতিক মানবাধিকার লঙ্ঘন বলছে, তা হলো— ১. বিক্ষোভ ও ভিন্নমত দমনের কৌশল হিসেবে রাজনৈতিক নেতা ও নিরাপত্তা বাহিনীর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা সজ্ঞানে সমন্বয়ের মাধ্যমে ও নির্দেশনায় এইসব মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা ঘটান। ২. ২০২৪ সালের ৫ জুন সরকারি চাকরিতে ৩০% মুক্তিযোদ্ধাদের বংশধরদের জন্য রেখে হাইকোর্ট রায় দিলে বিক্ষোভের সূত্রপাত হয় এবং জনগণের মধ্যে গভীর অসন্তোষের মূলে ছিল সীমাহীন দুর্নীতি, লুটপাট, দলীয়করণ, ধ্বংসাত্মক শাসনব্যবস্থা ও ভিন্নমত দমনের নানা রাজনীতি। ৩. জনগণের সমস্যা সমাধান করতে সরকার চরমভাবে ব্যর্থ হয়েছিল; সাথে দেখা দিয়েছিল চরম বৈষম্য, পাচার, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অধিকার হরণের নানা উপায়-উপকরণ। ৪. শেখ হাসিনার সরকারের প্রতি অনাস্থা জানিয়ে পেশাদার ও ধর্মীয় পটভূমি থেকে হাজার হাজার নাগরিক, নারী ও শিশুসহ সবাই অর্থপূর্ণ সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক সংস্কারের আহ্বান জানিয়ে বিক্ষোভ করেন। জনগণের ক্রমবর্ধমান ক্ষোভ দমন করা এবং ক্ষমতা আঁকড়ে থাকার প্রচেষ্টায় সরকার সহিংস উপায় অবলম্বন করে পদ্ধতিগতভাবে বিক্ষোভ দমন করার চেষ্টা করে। ৫. জুলাইয়ের মাঝামাঝি সময়ে শেখ হাসিনার সরকার ও আওয়ামী লীগ অতিরিক্ত সশস্ত্র কর্মীদের একত্রিত করে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস ও তার আশেপাশে শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভকারী শিক্ষার্থীদের ওপর ভোঁতা, ধারালো ও আগ্নেয়াস্ত্র দিয়ে হামলা চালায়। এসময় সারাদেশে যেখানেই বিক্ষোভ হয়েছে, সেখানেই ছাত্রলীগ হামলা চালিয়েছে। ৬. শিক্ষার্থীরা বেশিরভাগ সময় আত্মরক্ষা করেছে; এর প্রতিক্রিয়া হিসেবে সরকারের পুলিশ বাহিনী আরও সহিংসতার আশ্রয় নেয়। ১৭ জুলাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের একটি বড় শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভে পুলিশ ও ছাত্রলীগ হামলা চালায়, যা ছিল আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন। ৭. এইসব ঘটনার পর বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি), বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী ও আন্দোলনকারী ছাত্র-জনতা ‘কমপ্লিট শাটডাউন’ কর্মসূচি দেয়; এর প্রতিক্রিয়ায় শেখ হাসিনার সরকার সহিংসতা আরও বাড়িয়ে দেয়, ফলে স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত হতে থাকে। ৮. র্যাব ও পুলিশ বাহিনী হেলিকপ্টার থেকে গুলি ও গ্রেনেড ছুঁড়েছে; বিজিবি সামরিক রাইফেল ও শর্টগান ব্যবহার করেছে। সরকারের নিরাপত্তা বাহিনীকে প্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহারের অনুমতি দেওয়া হয়; ১৯ জুলাই রংপুরে ছাত্র আবু সাঈদকে কাছ থেকে গুলি করে হত্যা করা হয়। সেদিন সারাদেশে ব্যাপক হতাহতের ঘটনা ঘটে; নিরাপত্তা বাহিনী বিক্ষোভকারীদের খুব কাছ থেকে গুলি করে সংক্ষিপ্ত মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করে। ৯. কিছু ক্ষেত্রে সেনাবাহিনী বিক্ষোভকারীদের ওপর গুলি চালায়, আবার মাঠে থাকা জুনিয়র অফিসাররা ক্রমাগত আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহারের আদেশ প্রত্যাখ্যান করেন। ১০. জুলাইয়ের শেষের দিকে ও আগস্টের ৫ তারিখে বিক্ষোভকারীদের ঢাকামুখী পদযাত্রা ঠেকাতে সেনাবাহিনী, বিজিবি এবং পুলিশকে ব্যবহার করে একটি সরকারি পরিকল্পনা করা হয়; এতে প্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহার করতে বলা হয়। পুলিশ গুলি করলেও সেনাবাহিনী এবং কিছু জায়গায় বিজিবি বেশিরভাগ ক্ষেত্রে দাঁড়িয়ে ছিল। পুলিশের সেদিনের ভূমিকা ছিল সুস্পষ্ট মানবাধিকার লঙ্ঘন। ১১. বিক্ষোভ দমনে সরকারের যে সকল বাহিনী জড়িত ছিল, তারা হলো—পুলিশ, সশস্ত্র বাহিনীর গোয়েন্দা অধিদপ্তর (ডিজিএফআই), জাতীয় নিরাপত্তা গোয়েন্দা সংস্থা (এনএসআই), টেলিযোগাযোগ পর্যবেক্ষণ কেন্দ্র (এনটিএমসি), পুলিশের গোয়েন্দা শাখা (ডিবি), বিশেষ শাখা এবং সন্ত্রাসবাদ ও আন্তঃদেশীয় অপরাধ দমন ইউনিট (সিটিটিসি)। এ সকল সংস্থা সরাসরি সহিংস উপায়ে বিক্ষোভ দমনের কাজ করেছে, যা ছিল চরম মানবাধিকার লঙ্ঘন। ১২. এই সকল সরকারি সংস্থা নাগরিকদের গোপন নথি প্রকাশ করেছে এবং গণগ্রেপ্তার, আটক, নির্যাতন, আটককৃতদের কাছ থেকে অর্থ আদায়, স্বীকারোক্তি আদায়ে নির্বিচারে অত্যাচার, পরিবারের সদস্যদের এনে তাদেরকে আঘাত, যৌন হয়রানি, মানসিক ও শারীরিক অত্যাচারসহ নানাবিধ উপায়ে নির্যাতন করেছে। ১৩. সিটিটিসিতে শিশুদের আটক, পুলিশের গোয়েন্দা শাখা মিন্টো রোডে এবং ডিজিএফআই দ্বারা ছাত্র নেতাদের অপহরণ ও নির্যাতন এবং বিক্ষোভ কর্মসূচি প্রত্যাহারে বাধ্য করার চেষ্টা, ডিজিএফআই, এনএসআই ও ডিবি শাখার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা পরিকল্পিতভাবে জীবনরক্ষাকারী চিকিৎসা সেবায় বাধা প্রদান, চিকিৎসক ও নার্সদের ভয় দেখানো, মৃত্যুর তথ্য সরিয়ে ফেলা, লাশ নিয়ে যাওয়া, হাসপাতাল থেকে গ্রেপ্তার ও নির্যাতন ইত্যাদি ছিল সুস্পষ্ট ও চরম মানবাধিকার লঙ্ঘন। ১৪. গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের নথি গোপন করার জন্য সরকার মন্ত্রিপর্যায় ও গোয়েন্দা সংস্থাগুলো একত্রে কাজ করেছে। ইন্টারনেট সেবা বন্ধ করা এবং একই সঙ্গে ডিজিএফআই, এনএসআই ও র্যাব ক্রমাগত গণমাধ্যমগুলোকে আন্দোলন দমনের খবর, তথ্য, ছবি ও ভিডিও প্রচার না করতে বাধ্য করেছে। সেই সাথে বিক্ষোভকারীদের সন্ত্রাসী ও জঙ্গি বানানোর প্রতিবেদন সংবাদে প্রচারে বাধ্য করা হয়েছিল। ভুক্তভোগী পরিবার ও আইনজীবীদের মুখ বন্ধ রাখতে ভয়ভীতি প্রদর্শনের কাজে সরাসরি ডিজিএফআই ও পুলিশ পরিকল্পিতভাবে জড়িত ছিল। ১৫. একই সময় আওয়ামী লীগ, ছাত্রলীগ, যুবলীগ ও পুলিশ রাজনৈতিক ভিন্নমতের (বিএনপি ও জামায়াত) হাজার হাজার নেতা-কর্মীর বাড়িতে হামলা করেছে। বিক্ষোভের সময় পুলিশ ও আওয়ামী লীগ পরিকল্পিতভাবে চট্টগ্রামে আদিবাসী, হিন্দু সম্প্রদায় ও আহমদীয় মুসলিম সংখ্যালঘু সদস্যদের ওপর হামলা চালায় এবং বাড়িঘর ও উপাসনালয় পুড়িয়ে দেয়। ১৬. ধর্মীয় ও জাতিগত বৈষম্য তৈরি করে নির্যাতন চালিয়ে মিডিয়াকে বাধ্য করা হয়েছে এর দায় ভিন্নমতের ওপর চাপিয়ে দিতে, যেন সব দায় বিএনপি ও জামায়াতের ওপর পড়ে। তবে ওএইচসিএইচআর গভীর নিরীক্ষা ও ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর সাথে কথা বলে এই তথ্য নিশ্চিত করেছে যে, সংশ্লিষ্ট ঘটনাগুলোতে বিএনপি ও জামায়াতের জাতীয় নেতৃত্ব কিংবা সাধারণ কোনো সদস্য জড়িত ছিল না; বরং তারা সংখ্যালঘু গোষ্ঠীগুলোর পাশে দাঁড়িয়েছে, সহযোগিতা করেছে এবং সংঘটিত ঘটনার নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছে। ১৭. সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের প্রত্যক্ষ সাক্ষ্য এবং অন্যান্য অভ্যন্তরীণ সূত্রের ভিত্তিতে ওএইচসিএইচআর এটি প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হয়েছে যে—রাজনৈতিক নেতৃত্বে সজ্ঞানে, সমন্বিতভাবে ও নির্দেশনায় এই গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘন ও নির্যাতনগুলো পুলিশ, আধা-সামরিক, সামরিক ও সকল গোয়েন্দা সংস্থা এবং আওয়ামী লীগের কাজের সমন্বয়ের মাধ্যমে সমান্তরালে কাজ করেছে। ১৮. উভয় পক্ষ একাধিক সূত্র থেকে মাঠপর্যায়ে পরিস্থিতি সম্পর্কে প্রতিবেদন পেয়েছিল। ঊর্ধ্বতন সরকারি সাক্ষ্য অনুযায়ী, ২১ জুলাই এবং আগস্টের শুরুতে কর্মকর্তারা শেখ হাসিনাকে যে প্রতিবেদন দিয়েছিলেন, সেখানে অতিরিক্ত শক্তি প্রয়োগের বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছিল। ১৯. রাজনৈতিক নেতারা এবং বাংলাদেশের পুলিশ ও সেনাবাহিনীর নেতৃত্বদানকারীরা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছিলেন, যার মাধ্যমে তারা চলমান মানবাধিকার লঙ্ঘনের ব্যাপারে সরাসরি জানতে পেরেছিলেন। তারপরেও রাজনৈতিক নেতৃত্ব বিজিবি, ডিজিএফআই, বাংলাদেশ পুলিশ ও গোয়েন্দা শাখাকে সরাসরি অভিযান চালাতে ও প্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহার করতে নির্দেশ জারি করেছিল। এসবের মধ্যে বিক্ষোভকারী ও বেসামরিক নাগরিকদের বিরুদ্ধে গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘন, বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড ও নির্বিচারে আটকের বিষয়গুলো রয়েছে। কী ছিল ওএইচসিএইচআর প্রতিবেদনে : ১. যেভাবে শুরু হয় ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং মিশন: ২০২৪ সালের ২৩ জুলাই বাংলাদেশে ছাত্র-জনতার ওপর সরকারের নিরাপত্তা বাহিনী, আওয়ামী লীগ, ছাত্রলীগ ও যুবলীগ ব্যাপক সহিংসতা চালায়। সেই প্রেক্ষিতে জাতিসংঘের











