নাজজেদা নাহার : প্রতিটি শিশুর প্রথম আয়না তার বাবা-মা। সেই আয়নায় সে নিজেকে দেখে শেখে—আমি কে, আমার কতটা মূল্য আছে, আমাকে ভালোবাসা যায় কী না। কিন্তু কিছু বাবা-মায়ের কাছে এই আয়নাটা উল্টো দিকে ফেরানো থাকে—সেখানে সন্তান নিজেকে দেখে না, বরং প্রতিফলিত হয় বাবা-মায়ের নিজস্ব প্রয়োজন, ইমেজ আর অহংকার। মনোবিজ্ঞানের ভাষায় একে বলে নার্সিসিস্টিক প্যারেন্টিং—এমন এক লালন-পালনের ধরন; যেখানে সন্তানকে দেখা হয় স্বতন্ত্র মানুষ হিসেবে নয়, বরং বাবা-মায়ের নিজস্ব চাহিদা পূরণের মাধ্যম হিসেবে। এখানে ভালোবাসা প্রায়ই শর্তসাপেক্ষ থাকে—সন্তান যখন বাবা-মায়ের প্রত্যাশা মেটায়, তখনই মেলে স্বীকৃতি; ব্যর্থ হলে জোটে উপেক্ষা বা সমালোচনা। Psychology Today-র কমিউনিকেশন বিশেষজ্ঞ প্রেস্টন নি এই ধরনের বাবা-মাকে বর্ণনা করেছেন এমন একজন হিসেবে, যিনি সন্তানের মাধ্যমে নিজের জীবন যাপন করেন, সন্তানের ওপর মালিকানাসুলভ মনোভাব পোষণ করেন, এমনকি নিজের সন্তানের সঙ্গেই এক ধরনের প্রচ্ছন্ন প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হন। গবেষণা যা বলছে: সমস্যাটা আসে কোথা থেকে নার্সিসিজম আসলে একটি ব্যক্তিত্ব-বৈশিষ্ট্যের ধারাবাহিকতা (spectrum)—একপ্রান্তে থাকে স্বাভাবিক, সুস্থ আত্মবিশ্বাস, আর চরম প্রান্তে থাকে নার্সিসিস্টিক পার্সোনালিটি ডিসঅর্ডার (NPD), যা একটি স্বীকৃত ক্লিনিক্যাল মানসিক স্বাস্থ্য-সমস্যা। একজন বাবা-মা এই স্পেকট্রামের যেখানেই থাকুন না কেন, তাঁর সন্তানের ওপর প্রভাব পড়তে পারে। আর এই প্রবণতা কেবল প্যারেন্টিং থেকেই আসে না—গবেষণা বলছে, কিছু শিশু জন্মগতভাবেই বেশি সংবেদনশীল বা আবেগীয়ভাবে তীব্র প্রতিক্রিয়াশীল হয়, এবং শৈশবের ট্রমা বা অস্থিতিশীল পরিবেশও এই ঝুঁকি বাড়াতে পারে। সহজ ভাষায়, জৈবিক প্রবণতা ও পারিবারিক অভিজ্ঞতা—দুটো মিলেই নার্সিসিস্টিক প্যাটার্ন গড়ে ওঠে। এই বিষয়ে দীর্ঘদিন দুটি প্রতিদ্বন্দ্বী তত্ত্ব চলে আসছিল। একদল মনোবিজ্ঞানী মনে করতেন, বাবা-মায়ের অতিরিক্ত প্রশংসা বা অতিমূল্যায়নই (overvaluation) সন্তানকে নার্সিসিস্ট বানায়। আরেকদলের যুক্তি ছিল ঠিক উল্টো—ভালোবাসার উষ্ণতার অভাবই এই প্রবণতার জন্ম দেয়। ২০১৫ সালে নেদারল্যান্ডসের গবেষক এডি ব্রুমেলম্যান ও তাঁর সহকর্মীরা ৫৬৫টি শিশু ও তাদের বাবা-মায়ের ওপর দেড় বছর ধরে চালানো একটি দীর্ঘমেয়াদি গবেষণায় (PNAS) এই বিতর্কের অনেকটাই মীমাংসা করে দেন। ফলাফল স্পষ্টভাবে প্রথম তত্ত্বের পক্ষে যায়—শিশু নার্সিসিস্ট হয়ে ওঠে বাবা-মায়ের অতিরঞ্জিত মূল্যায়ন আত্মস্থ করার মধ্য দিয়ে, ভালোবাসার অভাব থেকে নয়। “আমি অন্যদের চেয়ে শ্রেষ্ঠ”, “আমার বিশেষ সুবিধা পাওয়ার অধিকার আছে”—এই ধরনের বার্তা শিশু বিশ্বাস করতে শুরু করে যখন বাবা-মা বারবার তাকে ‘অসাধারণ’ বলে চিহ্নিত করেন। এই গবেষণারই একজন সহ-লেখক, মনোবিজ্ঞানী ব্র্যাড বুশম্যান পরে মন্তব্য করেছিলেন, শিশুরা বিশ্বাস করে বাবা-মা যখন বলেন তারা অন্যদের চেয়ে বিশেষ—আর এটা তাদের জন্য বা সমাজের জন্য মোটেও ভালো ফল বয়ে আনে না। আকর্ষণীয় বিষয় হলো, গবেষণায় দেখা গেছে সন্তানের প্রকৃত আত্মসম্মানবোধ (self-esteem) গড়ে ওঠে বাবা-মায়ের উষ্ণতা থেকে, অতিমূল্যায়ন থেকে নয়। অর্থাৎ, প্রশংসা আর ভালোবাসা এক জিনিস নয়—আর এই পার্থক্যটা বোঝা নার্সিসিস্টিক প্যারেন্টিং চেনার প্রথম চাবিকাঠি। চেনার উপায়: কিছু পুনরাবৃত্ত প্যাটার্ন ক্লিনিক্যাল সাইকোলজিস্ট মেরি অ্যান লিটল তাঁর Childhood Narcissism বইয়ে এবং Psychology Today-তে প্রকাশিত একাধিক নিবন্ধে লিখেছেন, নার্সিসিস্টরা কাঠামোগতভাবেই ‘যথেষ্ট ভালো’ বাবা-মা হওয়ার সক্ষমতা রাখেন না—কারণ তাঁদের মনোযোগ মূলত নিজের দিকেই ফেরানো থাকে। সন্তানের প্রায় অফুরন্ত মনোযোগ ও স্নেহের প্রয়োজন হলেও এই বাবা-মায়ের কাছে দেওয়ার মতো আবেগীয় শক্তি অবশিষ্ট থাকে না। ২০২৩ সালে প্রকাশিত তিনটি আন্তর্জাতিক গবেষণা—Lyons ও সহকর্মীদের, Hoxhaj-এর এবং Torres-এর—পৃথকভাবে একই সিদ্ধান্তে পৌঁছেছে: নার্সিসিস্টিক বাবা-মায়ের সন্তান হওয়ার অভিজ্ঞতা আত্মমূল্যবোধ, সংযুক্তি-শৈলী, রোমান্টিক সম্পর্ক ও আবেগীয় স্থিতিশীলতার ওপর স্বীকৃত ও শনাক্তযোগ্য প্রভাব ফেলে। এমনকি নার্সিসিজম এক প্রজন্ম থেকে পরের প্রজন্মে সঞ্চারিত হওয়ারও প্রমাণ মিলেছে। এই প্যারেন্টিংয়ের বৈশিষ্ট্যগুলো আলাদা আলাদাভাবে দেখলে হয়তো তেমন উদ্বেগজনক মনে হয় না, কিন্তু একসঙ্গে দেখলে একটা স্পষ্ট প্যাটার্ন ধরা পড়ে। প্রথমত, সন্তান যদি অসাধারণ প্রতিভাবান হয়, তাহলে তাকে বাবা-মায়ের নিজস্ব গৌরবের সম্প্রসারণ বানিয়ে ফেলা হয়—আর হতাশ করলে জোটে কঠোর প্রত্যাখ্যান। দ্বিতীয়ত, শিশুসুলভ স্বাভাবিক দুষ্টুমি বা ভুলকেও এই বাবা-মায়েরা ব্যক্তিগত অপমান হিসেবে নেন, কারণ তাঁরা মনে করেন এতে তাঁদের নিজেদের ভাবমূর্তি নষ্ট হচ্ছে—ফলে সন্তান শেখে নিখুঁত হওয়ার চাপ, নয়তো লজ্জাবোধ। তৃতীয়ত, অতিরিক্ত নিয়ন্ত্রণ, নির্দেশনা আর সমালোচনার মধ্য দিয়ে সন্তানের নিজে সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ কেড়ে নেওয়া হয়, যার ফলে আত্মবিশ্বাস ধীরে বিকশিত হয়। আর সবচেয়ে গভীর ক্ষতটা হয়তো এখানেই—এই বাবা-মায়েরা সন্তানকে যেমন সে ঠিক তেমনভাবে ভালোবাসতে পারেন না; তাঁরা ভালোবাসেন কল্পিত, আদর্শ সন্তানকে। শর্তসাপেক্ষ এই ভালোবাসা থেকে জন্ম নেয় গভীর এক অনুভূতি—আমি হয়তো ভালোবাসার যোগ্যই নই। সন্তান বড় হয়ে নিজের পথ বেছে নিতে শুরু করলে সমস্যাটা আরও প্রকট হয়ে ওঠে। প্রেস্টন নি লক্ষ্য করেছেন, শিক্ষাগত-পেশাগত পথ বাছাই থেকে শুরু করে নিজস্ব বন্ধু বা জীবনসঙ্গী বেছে নেওয়া পর্যন্ত—স্বাতন্ত্র্যের প্রতিটি প্রকাশকে দেখা হয় ব্যক্তিগত আক্রমণ হিসেবে। সন্তানের জীবনে রোমান্টিক সঙ্গীর আগমন প্রায়ই বড় হুমকি হিসেবে বিবেচিত হয়, কারণ তা বাবা-মায়ের নিয়ন্ত্রণের বৃত্ত ভাঙার ইঙ্গিত দেয়। আমাদের প্রেক্ষাপটে একটি পর্যবেক্ষণ: বাংলাদেশের মতো সমাজে, যেখানে ‘পারিবারিক সম্মান’ ও ‘লোকে কী বলবে’—এই মানদণ্ডে সন্তান গড়ে তোলা হয়, সেখানে এই প্যাটার্নগুলো অনেক সময় স্বাভাবিক অভিভাবকত্ব হিসেবেই ধরা পড়ে না। সন্তানের রেজাল্ট বা চাকরিকে ‘আত্মীয়স্বজনকে গর্ব করে বলার মতো’ বিষয় বানিয়ে ফেলা, নিজের পছন্দে বিয়ে বা ক্যারিয়ার বেছে নিলে ‘তুই আমাদের মুখ রাখলি না’ বলে অপরাধবোধ চাপিয়ে দেওয়া, কিংবা সন্তানের আবেগ প্রকাশকে ‘বেয়াদবি’ বা ‘অকৃতজ্ঞতা’ বলে থামিয়ে দেওয়া—এসব এতটাই পরিচিত দৃশ্য যে অনেকে বড় হয়েও বোঝেন না তাঁদের অভিজ্ঞতার একটা নাম আছে। যখন সন্তান বড় হয় শৈশবের এই অভিজ্ঞতা প্রাপ্তবয়স্ক জীবনেও রয়ে যায়, রূপ পাল্টে। যাঁরা নার্সিসিস্টিক বাবা-মায়ের সন্তান, তাদের মধ্যে প্রায়ই দেখা যায় নিম্ন আত্মমূল্যবোধ, বিষণ্নতা, এমনকি জটিল PTSD-র লক্ষণ। এর কারণ খুঁজতে গেলে ফিরে যেতে হয় শৈশবেই—যেখানে সন্তান শিখেছিল নিজের আবেগীয় প্রয়োজন চেপে রাখতে, কারণ স্বীকৃতি নির্ভর করত তার পারফরম্যান্স বা অর্জনের ওপর। এই শেখা প্রাপ্তবয়স্ক জীবনে রূপ নেয় এক ধরনের ভেতরের শূন্যতায়, যা প্রায়ই ব্যাখ্যাতীত থেকে যায়। নিয়ন্ত্রণও থামে না বড় হওয়ার পর। থেরাপিস্ট জেনিফার ফ্রিডি ও তাঁর সহলেখকের একটি নিবন্ধ অনুযায়ী, নার্সিসিস্টিক বাবা-মায়েরা প্রায়ই প্রাপ্তবয়স্ক সন্তানকেও গ্যাসলাইট করে চলেন—পুরনো নিয়ন্ত্রণের ধরনে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করেন। এই জটিল সম্পর্কগুলো উদ্বেগ, বিষণ্নতা, বিভ্রান্তি, অসহায়ত্ব, ক্রোধ, ক্লান্তি আর গভীর শোকের এক অন্তহীন চক্র তৈরি করতে পারে। তবে ভালো খবরও আছে—ট্রমা-সংবেদনশীল ও সংযুক্তি-কেন্দ্রিক থেরাপি এই চক্র ভাঙতে কার্যকরভাবে সাহায্য করতে পারে। আরেকটি সাধারণ প্রবণতা হলো সম্পর্কের একটি ত্রুটিপূর্ণ মডেল বহন করা। নার্সিসিস্টিক বাড়িতে বড় হওয়া সন্তান প্রায়ই ‘ঊর্ধ্ব-নিম্ন’ ধরনের সম্পর্ককেই স্বাভাবিক বলে ধরে নেয়—কারণ ছোটবেলা থেকে সে নিজেই বাবা-মায়ের আবেগীয় প্রয়োজন মেটানোর ভূমিকায় অভ্যস্ত। এই প্যাটার্ন অজান্তেই পরবর্তী জীবনের বন্ধুত্ব, প্রেম এমনকি কর্মক্ষেত্রের সম্পর্কেও প্রতিফলিত হতে থাকে—কখনো নিজেকে বারবার নিয়ন্ত্রণকারী সঙ্গীর কাছে খুঁজে পাওয়া, কখনো বা নিজের ভেতরেই বাবা-মায়ের কিছু আচরণের প্রতিচ্ছবি আবিষ্কার করা। (এখানে ব্যবহৃত ‘জটিল PTSD’, ‘গ্যাসলাইট’, ‘নার্সিসিস্টিক পার্সোনালিটি ডিসঅর্ডার’ ইত্যাদি পরিভাষা শিক্ষামূলক উদ্দেশ্যে ব্যবহৃত—এগুলো কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তি বা সম্পর্কের ক্লিনিক্যাল নির্ণয় নয়। কারো আচরণ এসব মাপকাঠিতে পড়ে কী না, তা কেবল একজন প্রশিক্ষিত মানসিক স্বাস্থ্য পেশাদারই নির্ধারণ করতে পারেন।) ক্ষতির ভেতরেও যা বেঁচে থাকে তবে এই গল্প শুধুই ক্ষতির নয়। মনোবিজ্ঞানী চিকি ডেভিস একটি গুরুত্বপূর্ণ ও প্রায়ই উপেক্ষিত দিক তুলে ধরেছেন—নার্সিসিস্টিক বাবা-মায়ের সন্তানেরা