মনের যত্নে মানুষ, মানুষের যত্নে সমাজ
মোহাম্মদ রাসেল : ‘মন’ হলো, দেহতরী। তরীর সুপথ বিনে দেহের সুপথ হয় না। আবার দেহের সুস্থতা তরীকে সঠিক নিশানায় নিয়ে যায়। দেহ ও মন এক হলে, ‘যোগ’ হয়। যোগ সাধনা হলো, ব্রহ্ম খোঁজার অন্যতম সাধনা। দেহ-মন উভয় একই সময় সুস্থ হলে, তবেই চৈতন্যের আশা করা যায়। সেই দেহের তরী অর্থাৎ মনের ব্যাপারে আমরা কতটুকু যত্নশীল? কিংবা অপরের মনের ওপর আমরা কতটুকু সচেতন? কয়েক বছর আগে পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) জনশুমারি ও গৃহগণনার প্রতিবেদন অনুযায়ী, দেশের মোট জনগোষ্ঠীর প্রায় এক কোটি ৯০ লাখের বেশি মানুষ মানসিক সমস্যায় ভুগছেন। অর্থাৎ, ১৮% মানুষ কোনো না কোনো মানসিক রোগে ভুগছেন। জুলাই আন্দোলনের কয়েক বছর আগের জরিপ এটি। তাহলে ভেবে দেখুন, আন্দোলনের পর মানসিক অবস্থা আরো কত অবনতি হতে পারে! কেননা, বহু অনৈক্যের ফলে অনেক মানসিক সমস্যার সৃষ্টি করে। আসা যাক, ১৮% সংখ্যাটা কত বড়! সেটা ছোট করার জন্যে যে পরিমাণ মনোরোগ বিশেষজ্ঞ, মনোবিজ্ঞানী, সাইকিয়াট্রিক সোস্যাল ওয়ার্কার ও অকুপেশনাল থেরাপিস্ট প্রয়োজন, সে তুলনায় তা আছেন অত্যন্ত নগণ্য পরিসরে। মানসিক হাসপাতালেরও একটা সংকট আছে। তাছাড়া, দেশের মানুষের মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে জানা, শিক্ষা, সচেতনতা ও সঠিক আচরণেও বিরাট অভাব রয়েছে। উল্টো রয়েছে, মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে নানা কুসংস্কার। ফলে মানসিক রোগীদের সাথে বিরূপ আচরণ, অসম্মান, অমর্যাদা, অত্যাচার ও হেয় প্রতিপন্ন করেন অধিক লোকজন। এ দেশেই খবর পাওয়া যায়, গাড়ির চাকায় পিষ্ট মানসিক রোগী কিংবা মানসিক ভারসাম্যহীন যুবককে গলা কেটে হত্যা অথবা মানসিক রোগীকে পথে-গারদে গণধর্ষণ! মনের দুটি অংশ। একটি দেখা যায়, অন্যটি দেখা যায় না। মনের ব্যবহারিক কার্যকলাপ আমরা দেখতে পাই, কিন্তু মনের প্রক্রিয়া আমরা দেখতে পাই না। ফলে কারোর বিচার করার অধিকার আমাদের যেমন নেই, তেমনই কাউকে দোষারোপ করার সঠিক কারণও হতে পারে না। কারোর একটি অংশ দেখে বিচার করতে বসা বড়ই অবিচার! তারচে বরং, দেখা লোকদের মানসিক প্রক্রিয়া সম্পর্কে অবগত হই। মানুষের আবেগ, চিন্তা, তথ্য, স্মৃতি, উপলব্ধি ও দৃষ্টিভঙ্গি এসব মানসিক প্রক্রিয়ায় পড়ে। এসব তৈরি হয় জৈবিক, মানসিক ও সামাজিক বৈশিষ্ট্য থেকে। ফলে কারোর নিজের হাত নেই আজকের তার মানসিক অবস্থার জন্যে। কারোর যেহেতু একইভাবে এ তিনটির বিকাশ বা গঠনে ভূমিকা রাখে না, সেক্ষেত্রে সকলের মানুষের ভিন্ন ভিন্ন বিকাশ ও আচরণ বা অবস্থা তৈরি হয়। আমাদের কাজ হলো, পারস্পরিক সমঝোতা। মানসিক রোগীদের ওপর অনেকেই নিপীড়নমূলক আচরণ করেন। মনে করেন, ওনারা ইচ্ছে করে পাগলামি করে। কিন্তু এটি যে ইচ্ছের অনেক বাহিরে একটি অবস্থা, সেটা কেউই বুঝেন না এবং কেউবা বুঝেও সহ্য করতে পারেন না। সঠিক আচরণ তো আরো দূরে! আমার কাছে কেন মানুষ এতো পবিত্র–দেবতুল্য? কেন মানুষকে আমি মাথায় তুলে রাখতে চাই? কারণ, যখন জানতে ও উপলব্ধি করতে সক্ষম হই, মানুষ আসলে কিছুই করে না। তখনই মানুষের প্রতি দোষারোপ করা আর বিন্দুমাত্র থাকে না। মানসিক রোগ হয় জৈবিক, সামাজিক ও মানসিক বৈশিষ্ট্যের তিনটা ফ্যাক্টরের জটিল মিথস্ক্রিয়া থেকে। যখন জৈবিক বৈশিষ্ট্য মেইন রোল প্লে করে, তখন একধরনের রোগ হয়, আবার যখন সামাজিক কিংবা মানসিক বৈশিষ্ট্য মেইন রোল প্লে করে, তখন ভিন্ন ভিন্ন মানসিক রোগের উদঘাটন হয়। তাই মানসিক রোগে রোগী একটা পুতুল, এ দায় তার নয়; দায়ী বা সমস্যা হলো, উক্ত তিন ফ্যাক্টরের। ফলে উক্ত তিন ফ্যাক্টর যদি আমরা না বুঝে থাকি, তবে আমরা অজ্ঞাতভাবেই দোষ দেব—আঘাত করব পুতুলরূপে মানসিক রোগীদের। তাই মূল সমস্যা বুঝতে হবে, জানতে হবে যে রোগের ব্যাপারে মানসিক রোগীদের কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই। বরঞ্চ, আমাদের সঠিক আচরণে তাকে হয় ধীরে ধীরে সুস্থ–স্বাভাবিক করে তুলবে, নয়তো খোঁচামূলক বা ভুল আচরণে তাকে ক্ষেপিয়ে তুলে আরো অবনতির দিকে ঠেলে দেবে। অর্থাৎ মানসিক রোগীদের নিজের প্রতি যতটা নিয়ন্ত্রণ বা প্রভাব থাকে, তারচে বরং তাদের প্রতি আমাদের আচরণের প্রভাব অনেক অনেক অনেক বেশি। তাই তাদের প্রতি আমাদের আচরণে সচেতনতা, করুণা ও সম্মান জরুরি। যদি আমরা আমাদের আচরণের মধ্য দিয়ে মানসিক স্বাস্থ্যবান্ধবে ভূমিকা রাখি, তবেই ফ্যাক্টরগুলো সঠিকভাবে বিকাশ লাভ করবে। সমাজে মানসিক রোগীও হ্রাস পাবে। এ বিষয় সংক্রান্ত একটা ঘটনা বলছি, সেদিন শুক্রবার বিকেলে বিপ্লব উদ্যান হয়ে প্রবর্তক মোড়ে যাচ্ছিলাম। হুট করে ফোন আসলো ডিরেক্টর সাহেবের, ‘আজ রিহার্সাল রয়েছে’। ইদানীং উনি হুটহাট করে রিহার্সেল দিচ্ছেন। যাইহোক, সময় কাটাবার জন্যে মাত্র ২ ঘণ্টা সময় পাচ্ছি। প্রবর্তক মোড়ে পৌঁছাবার আগে ইসকন মন্দির পড়ে। গল্প সেখান থেকেই শুরু। মন্দিরটা পাহাড়ের ওপরে। ফলে উঁচু থেকে নামছিল সোনালী দি। তিন বছর পর আজ দেখা। দূর থেকেও চেনা যায়। সেই একই ছন্দ, গতি আর ভঙ্গি। শুধু চেহারাটা কিছুটা বদলে গিয়েছে। দেখতে পেয়ে ডাক দিলাম। আমাকে দেখে দৌড়ে এসে কাছে দাঁড়ালো। আহা, কতদিন পর দেখা! কেবল চোখের নিচে কালি আর চেহারায় বিষণ্নতার ছাপ ছাড়া কোনো বদল নেই। একপাশে দাঁড়িয়ে আলাপচারিতা হতে হতে দিদির পাশে দুই তরুণী এসে দাঁড়ালো। দিদি পরিচয় করিয়ে দিলেন, জানলাম দুজনেই ওনার মেয়ে। দিদির সাথে কত গবেষণাধর্মী গ্রুপ কাজ করেছি; কিন্তু কখনো জানতে চাইনি পরিবারের কথা! অবশ্য জানার প্রয়োজনও বোধ করিনি। দিদির মেয়েগুলোর পরিচয় জানতে পেয়ে হিসেব মেলালাম। একজন আমারই বয়সী আর অন্যজন আমার চেয়ে কয়েক বছরের বড়। বড়জন আছেন মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকে। দিদির দুই মেয়ে যখন আমাকে ‘মামা, মামা’ বলে সম্বোধন করছে, রাগে যা হয়েছিল না! কাজের সূত্রে সোনালী দি’কে যখন দিদিই বলে ডেকেছি, তখন এ কাফ্ফারা মাথায় পেতে নিতে হবে। কিছু করার নেই! যাকগে, আলাপে জানতে পারলাম ওনারা শিল্পকলার দিকে যাবেন। আমিও যেহেতু একই পথে যাব, সেহেতু ওনাদের গাড়িতে উঠে পড়লাম। ড্রাইভারকে বলে গাড়ি থামিয়ে গোলপাহাড় আমাদের নামতে হলো, দিদির ছোট মেয়ে অর্থাৎ যে আমার বয়সী তার কী যেন একটা পছন্দ হলো। সেটা কেনার জন্যে দিদি, ছোটজন আর আমি গাড়ি থেকে নামলাম। বড়জন নামলেন না। চুপচাপ বসেই আছেন। ছোটজন একবার তাকে আসার জন্যে বললেন, কিন্তু তিনি কোন হ্যাঁ/না শব্দ করলেন না। কেনা শেষে গাড়িতে উঠব, অমনি বড়জন গিয়ে উঠলেন রেস্তোরাঁয়। দিদিসহ আমরাও রেস্তোরাঁয় গিয়ে বড়জনের টেবিলে বসলাম। অদ্ভুত ব্যাপার! রেস্তোরাঁর ক্যাশিয়ারের সাথে এক যুবক ওয়েটারের বাকযুদ্ধ হচ্ছে। অন্য দুই তরুণ ওয়েটার যুবক ওয়েটারকে বুঝিয়ে শান্ত করার চেষ্টা করছে। আমাদের টেবিলের দায়িত্ব যুবক ওয়েটারের পড়েছে। ফলে অর্ডার করবার সময় হাসির বদলে আমাদের দিকে রাগী চোখে তাকাচ্ছে। অর্ডার করতে আমাদের খানিকটা দেরি হওয়াতে এ লোক ক্ষেপে উদ্যত আচরণ করে। সিদ্ধান্ত নেয়, আমাদের অর্ডার উনি নিবেন না! কেন? কারণ, আমরা অর্ডার দিতে দেরি করেছি। ওনার ধৈর্যের বাঁধ ভেঙেছি, ফলে ওনার সময় নষ্ট হয়েছে তাই! তরুণ আর একজন ওয়েটার এসে ওনার বদলে আমাদের খাবারের অর্ডার নিচ্ছিল, অমনি উনি এসে তরুণের ওপর তৎক্ষণাৎ ভায়োলেন্ট অ্যাকশনও নিয়ে ফেললেন। এ ধরনের আচরণে আর এক মুহূর্তও ওখানে না বসে আমরা কিছু পথ হেঁটে পাশের রেস্টুরেন্টে বসলাম। আমরা চারজন বসে আছি, খাবার অর্ডার হলো। লক্ষ্য করলাম, দিদি খাচ্ছে না আর তাছাড়া দেখা হওয়ার পরও তেমন কথা বলছে না। কেমন যেন চুপচাপ! কিন্তু তিন বছর আগে কেউ যদি দিদিকে দেখতো, ওনার উৎফুল্ল চঞ্চলতা











