নিজস্ব প্রতিবেদক: মানুষের দৈনন্দিন কাজে ইন্টারনেটের ব্যবহার যতো বাড়ছে তার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে বহু ধরনের অভিনব প্রতারণার ঘটনা। বাসা ভাড়া, জামা-কাপড় কেনাকাটা থেকে শুরু করে প্রেমের নামে যৌনফাঁদসহ বহু অপরাধ সংঘটিত হচ্ছে। গেল প্রায় তিন মাসে পুলিশের কাছে এ ধরনের অভিযোগ এসেছে এক হাজার ৮২টি। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ঘটনা ৪৫৭টি অনলাইন কেনাকাটা সংক্রান্ত।
এসব অপরাধের অভিযোগ সামাল দিতে হিমশিম খেতে হচ্ছে পুলিশ প্রশাসনকেও। তবে গবেষণা বলছে, যে ঘটনাগুলো ঘটছে তার মাত্র প্রায় ২০ শতাংশ অভিযোগ পুলিশের কাছে আসে। বাকি সবই থেকে যায় আড়ালে। বিচারব্যবস্থার প্রতি অনাস্থা এবং লোকলজ্জার ভয়ে অনেক ঘটনা বিচারের বাইরে থেকে যায়।
গত ১ জুন থেকে ২৫ আগস্ট পর্যন্ত পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) সাইবার পুলিশ সেন্টারে জমা পড়েছে ১০৮২টি। এসব ঘটনার মধ্যে আরও রয়েছে অনলাইনে বিনিয়োগ সংক্রান্ত প্রতারণা ৩২১টি, চাকরির প্রতারণা ৪৯টি, ঋণ দেওয়ার প্রতারণা ৩২টি, এনআইডি সংশোধনের নামে ১১টি, মোবাইল ফোন রিচার্জ অথবা ডাটা কেনার নামে ৬৮টি অভিযোগ।
এছাড়াও রয়েছে দরবেশ সেজে, বাড়ি ভাড়া দেওয়ার নামে, পাসপোর্ট করানোর নামে, বৃত্তি দেওয়ার নামে, দামি পার্সেল পাঠানোর নামে, বিভিন্ন টিকিট বিক্রি, ফ্রিল্যান্সিংয়ের মাধ্যমে আয়, প্রেমের নামে যৌনফাঁদ পেতে প্রতারণার ঘটনাও।
এসব ঘটনায় অপরাধীদের অন্যতম কৌশল হলো- বড় অংকের টাকা না নিয়ে বরং ছোট অংকের (৫০০ – ১০০০) টাকা অনেক বেশি মানুষের কাছ থেকে হাতিয়ে নেওয়া। এতে ক্ষতির মাত্রা কম হওয়ায় অনেকে আইনি ব্যবস্থা নিতে থানায় কিংবা আদালতে যান না। আর এতেই ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যায় অপরাধীরা।
বহুল সংঘটিত অপরাধের মধ্যে রয়েছে প্রেমের নামে যৌনফাঁদে ফেলেও অনেকের কাছ থেকে টাকা আদায় করা। প্রথমে সম্পর্ক তৈরির মাধ্যমে একান্ত ঘনিষ্ঠ মুহূর্তের ভিডিও ধারণ করা হয়। পরে সেগুলো ছেড়ে দেওয়ার ভয় দেখিয়ে টাকা আদায়ের পাঁয়তারা চলে। নারী-পুরুষ উভয়েই এ ধরনের ফাঁদে পড়ছেন। একবার কারো থেকে টাকা আদায় করতে পারলে বার বার টাকার জন্য চাপ দেয় অপরাধীরা।
গ্রাহকদের ভাষ্য, হয়রানির শিকার হয়ে কোম্পানিগুলো এবং আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর কাছে অভিযোগ জানালেও মামলা না করার অযুহাতে ব্যবস্থা নেওয়া হয় না।
গত ২৫ ফেব্রুয়ারি অনলাইনে মোবাইল ফোন কিনতে গিয়ে প্রতারণার শিকার হয়ে ৬৮ হাজার ৫০০ টাকার ক্ষতির মুখে পড়েছেন জনৈক ওসামা বিন ওবায়েদ সাব্বির। পল্টন থানার জিডি নম্বর: ১৭৭৬। এ ঘটনার ৬ মাস পেরিয়ে গেলেও পুলিশ অপরাধী চক্রকে গ্রেফতার করতে পারেনি। থানায় অভিযোগের পর তিনি পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগেও তিনি অভিযোগ দিয়েছেন। তাতেও কাজ হয়নি।
এদিকে হুন্ডি, অনলাইন গ্যাম্বলিং, গেমিং, বেটিং, ফরেক্স এবং ক্রিপ্টোকারেন্সি ট্রেডিংয়ের মাধ্যমে সংঘটিত অবৈধ লেনদেন বৃদ্ধি পাওয়ায় সচেতনতামূলক নির্দেশনা রয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংকের।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পর্যবেক্ষণ বলছে, ডিজিটাল পেমেন্ট সিস্টেমকে কাজে লাগিয়ে এসব অপরাধ হুন্ডি প্রক্রিয়াকে সহজ ও ত্বরান্বিত করছে। এর ফলে একদিকে মুদ্রা পাচার বেড়ে যাচ্ছে এবং অন্যদিকে প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা হারাচ্ছে দেশ। এর ফলশ্রুতিতে দেশের অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
অনলাইন গ্যাম্বলিং, গেমিং, বেটিং, ফরেক্স এবং ক্রিপ্টোকারেন্সি ট্রেডিংয়ে পেমেন্টের মাধ্যম হিসেবে যেন মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসের (এমএফএস) হিসাবগুলো ব্যবহৃত হতে না পারে সেজন্য সংস্থাগুলোর প্রতি তাগিদ আছে বাংলাদেশ ব্যাংকের। তবে বিকাশ, নগদ, ইউপেসহ এমএফএস প্রতিষ্ঠানগুলোর তৎপরতাও সেভাবে দেখা যায় না।
